ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
জ্বালানি ব্যয়ের ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার কারণে চলতি মে মাসে ইউরোপ ও এশিয়াজুড়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম মন্থর হয়ে পড়েছে। এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল তীব্রভাবে কমে গেছে, যেখান দিয়ে শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হতো। এই সরবরাহ সংকোচনের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে অর্থনীতিবিদরা চলতি বছরের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছেন। জাতিসংঘ এখন কোভিড-১৯ মহামারি এবং ২০০৭-২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে দুর্বল অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের পূর্বাভাস দিচ্ছে। আর সাম্প্রতিক সমীক্ষাগুলো ইঙ্গিত করছে যে আশঙ্কার এই মন্দা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
ইউরোজোনের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় পতন
রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি জানিয়েছে, ইউরোজোনের পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) — যা সেবা ও উৎপাদন খাতের সামগ্রিক কার্যক্রম পরিমাপ করে — এপ্রিলের ৪৮.৮ থেকে কমে মে মাসে ৪৭.৫-এ নেমে এসেছে। এটি ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর এই অঞ্চলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় পতন। উল্লেখ্য, পিএমআই সূচক ৫০-এর নিচে নামলে তা সংকোচন এবং ওপরে থাকলে প্রবৃদ্ধিকে নির্দেশ করে।
ভবিষ্যতে পণ্যমূল্য আরও বাড়ার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই কেনাকাটা সম্পন্ন করায় উৎপাদন খাত এখনো কিছুটা সমর্থন পাচ্ছে। তবে অর্থনীতির তুলনামূলকভাবে অনেক বড় সেবা খাতের কার্যক্রম ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির পর সবচেয়ে দ্রুত গতিতে হ্রাস পেয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের প্রধান ব্যবসায়িক অর্থনীতিবিদ ক্রিস উইলিয়ামসন বলেন, “ইরান যুদ্ধের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে আকস্মিক বেড়েছে, তাতে সেবা খাত বিশেষ করে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।” তিনি জানান, এপ্রিল ও মে মাসের পিএমআই সূচক দেখায় যে বছরের প্রথম তিন মাসে সামান্য প্রবৃদ্ধির পর দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইউরোজোনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ০.২% হ্রাস পেতে পারে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও অন্যান্য দেশের চিত্র
যুক্তরাজ্যে ২০২১ সালের জানুয়ারির পর সেবা খাতে সবচেয়ে বড় পতনের কারণে দেশটির সামগ্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমেছে। চলতি বছরের শুরুতে অন্য দেশগুলোর চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও সেই গতি এখন দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে বলে সাম্প্রতিক পিএমআই জরিপ বলছে।
জরিপকৃত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফ্রান্স। দেশটির জাতীয় পিএমআই ২০২০ সালের শেষ দিকের — যখন বিশ্ব অর্থনীতি মহামারির কবলে ছিল — পর সবচেয়ে বড় পতনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জার্মানিতেও টানা দ্বিতীয় মাসের মতো ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমেছে, তবে তা ফ্রান্সের তুলনায় কিছুটা মৃদু। ইউরোজোনের বাইরে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিও সংকোচনের দিকে মোড় নিয়েছে, যেখানে নতুন ক্রয়াদেশ গত সাড়ে চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত কমেছে। জরিপ করা সব অর্থনীতিতেই নতুন অর্ডার কমে যাওয়া ইঙ্গিত করছে যে আগামী মাসগুলোতেও এই মন্দা অব্যাহত থাকবে।
মূল্যস্ফীতির নতুন উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিকেও নতুনভাবে উসকে দিচ্ছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর যে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছিল তা ক্রমে কমে আসছিল, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি তা আবার ঊর্ধ্বমুখী করছে।
ইউরোজোনের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তাদের উৎপাদন খরচ গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বেড়েছে এবং পণ্যের দামও গত ৩৮ মাসে সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়ছে। ঐতিহাসিক ধারার ওপর ভিত্তি করে এসঅ্যান্ডপি অনুমান করছে, এই মূল্যবৃদ্ধি আগামী মাসগুলোতে ভোক্তা মূল্যস্ফীতিকে প্রায় ৪%-এ নিয়ে যেতে পারে, যা ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) ২% লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ।
সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল










কমেন্ট করুন