Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি

এইচএসসির ফলে প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য, শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রশ্নবিদ্ধ দায়

ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
আগের বছরের তুলনায় ব্যাপক ধস নেমে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬-এর ফলাফলে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা শিক্ষাঙ্গনে চরম আলোচনার সৃষ্টি করেছে। পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। বিশেষ করে ইংরেজি ও তথ্য প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে রেকর্ডসংখ্যক ফেলের কারণেই সার্বিক পাসের হারে এই বড় বিপর্যয় ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, এই ফল বিপর্যয়ের পেছনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং কাঠামোগত শিক্ষাব্যবস্থার সম্মিলিত ব্যর্থতা ও ধারাবাহিক সংকট দায়ী।
বিগত দুই দশকের বেশি সময় ধরে পরিচালিত পাবলিক পরীক্ষার উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার সর্বকালের তলানিতে নেমে এসে এবার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫১.৬২ শতাংশে, যা আগের বছরে ছিল ৫৭.১২ শতাংশ। আর মাদ্রাসা ও কারিগরি সহ মোট ১১টি বোর্ডে সার্বিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২.১২ শতাংশে (পূর্ববর্তী বছর যা ছিল ৫৮.৮৩ শতাংশ)। এছাড়া সার্বিক জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও এক বছরের ব্যবধানে কমেছে প্রায় ২৯ হাজার ১৩টি।
আঙ্কিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এবার ১১টি বোর্ডে মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। এর মধ্যে কেবল ইংরেজিতে ফেল করেছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। শুধুই এই দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ লাখ ২১ জন, যা মূল পাসের হারে বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক—এই তিন বিভাগের ফলাফলের সারণি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মানবিক বিভাগে। এই বিভাগে পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪২.১৭ শতাংশে; যেখানে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৫০.৭৭ শতাংশ এবং বিজ্ঞান বিভাগে ৭৩.১২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন। ভৌগোলিক বিচারে কেবল ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭০ শতাংশের ওপরে থাকলেও, বরিশাল (৪৫.৯২%) এবং যশোর বোর্ডে (৪৫.০৫%) ইংরেজিতে সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।
ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে ক্রমাগত ফল বিপর্যয়ের পেছনে মৌলিক ‘কাঠামোগত দুর্বলতা’কে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, মাধ্যমিক স্তরে এই দুই বিষয়ে পর্যাপ্ত দক্ষ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় বিকল্প বিষয়ের শিক্ষকদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠানো হয়। ফলে মাধ্যমিকের এই মৌলিক ঘাটতি নিয়ে শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিকে এসে দুই বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে পড়াশোনা কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রাম ও শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বৈষম্য, কার্যকর আইসিটি ল্যাবের অভাব ও গাইড-প্রাইভেট নির্ভরতা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
ফল বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরপত্র মূল্যায়নে সরকারের কঠোর অবস্থানও পাসের হার কমার অন্যতম কারণ। অতীতে রাজনৈতিক বা বোর্ডের কৃত্রিম ভাবমূর্তি রক্ষার তাগিদে পরীক্ষার খাতায় ঢালাওভাবে ‘গ্রেস মার্কস’ দিয়ে পাসের হার ও জিপিএ-৫ বাড়িয়ে রাখার যে প্রবণতা ছিল, এবার তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। প্রশ্নপদ্ধতির ধরন পরিবর্তন ও খাতা মূল্যায়নে প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের কারণে কেবল মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা পাস নম্বর তুলতে হিমশিম খেয়েছেন। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ডিভাইসে আসক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারকেও মনোযোগের ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, “এটাকে ফলবিপর্যয় না বলে বলতে হবে শিক্ষার প্রকৃত চিত্র সামনে এসেছে। এতদিন গ্রেস দিয়ে বা খাতা ভরলেই পাস করিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। করোনা ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি শহর-গ্রাম ও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করতে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে মনোযোগ দেওয়া দরকার।”
একই সুর তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের চরম সংকট ও শিক্ষকদের অপ্রতুল বেতন-ভাতাকে দীর্ঘমেয়াদী ব্যর্থতার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শিক্ষাবিদদের অভিমত, কাঠামোগত সংস্কার, গ্রামে পর্যাপ্ত মানসম্মত শিক্ষক পদায়ন এবং শিক্ষার প্রকৃত মান নিশ্চিত না করলে এ বিপর্যয় থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন