Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি

রংপুরের চাঞ্চল্যকর চার খুন: ঘাতক মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের স্বীকারোক্তি জানালো মহানগর পুলিশ

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:

রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর সহধর্মিণী ও দুই সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসই প্রকৃত অপরাধী বলে নিশ্চিত করেছে রংপুর মহানগর পুলিশ। গ্রেপ্তার আসামিদের আদালতে প্রদত্ত জবানবন্দির ভিত্তিতে পুলিশ জানায়, নিহত চারজনের মধ্যে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে বাসাবাড়ির ছাদেই হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ড শেষে গণপতির মরদেহ টিনের নিচে এবং স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ পাশের ছাদ থেকে চোখ এড়াতে ছাদের সিঁড়িঘরের গেটের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়।
আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে আলোচিত এই মামলার তদন্ত সংক্রান্ত অগ্রগতি জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য পরিবেশন করেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের বিজ্ঞ কমিশনার আসামি সিদ্ধার্থ দাসের বিচারকের খাসকামরায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কিয়দাংশ পাঠ করে শোনান।
জবানবন্দির বিবরণ দিয়ে সিদ্ধার্থ দাস উল্লেখ করেন, ‘ইয়াবা আগে মাঝেমধ্যে উৎসব হলে খাইতাম। গত এক মাসে প্রতি বৃহস্পতিবার একটা করে ইয়াবা খাই। ২১ আগস্ট (শুক্রবার) ভোরের সময়। সম্প্রতি আমার বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়। বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর প্রাইভেসির জন্য সে বিজয় কাকুর বাসায় ছয়-সাত মাস ধরে ঘুমায়। খাওয়া-দাওয়া করে বাসায় থাকে, বিজয় কাকুর বাসায় ঘুমায়। গত এক মাস ধরে বৃহস্পতিবার সীমান্তদের বাসায় থাকে। সীমান্ত নেশা করে না। ঘটনার বিষয়েও কিছু জানে না।’
নগর পুলিশ প্রধানের বর্ণনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার পরপর সিদ্ধার্থ দাস ইয়াবা সাথে নিয়ে মুগ্ধ দাসকে সাথে করে সীমান্তের বাসভবনে গমন করেন। সেখানে গিয়ে তারা তিনটি ইয়াবাবড়ি সেবন করেন। রাত ৩টার সময় পুনঃপ্রয়োজনে কামাল কাছনা এলাকার ইয়াবা কারবারি শান্তর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং আরও চারটি ইয়াবা সংগ্রহ করেন। ইয়াবার মূল্য পরিশোধে সিদ্ধার্থ নিজের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি গচ্ছিত রাখেন।
পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, ইয়াবা সংগ্রহের পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ পুনরায় সীমান্তের বাসায় ফিরে আসেন। রাত ৩টা অতিক্রান্ত হওয়ার পর তারা সেখান থেকে বের হলে রাস্তায় পথকুকুর দেখতে পান। কুকুরের ভয়ে তারা দেয়াল টপকে নিকটবর্তী দেবুদের বাসায় প্রবেশ করেন। সেখান থেকে ভবনের ছাদ ব্যবহার করে পরবর্তীতে গণপতি চক্রবর্তীর ছাদসীমানায় গিয়ে নামেন।
পুলিশ কমিশনার জানান, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদ চারপাশে হাফ-ওয়াল পরিবেষ্টিত হওয়ায় বাইর থেকে দেখার সুযোগ ছিল না। ছাদের পানির ট্যাংকের পেছনে অবস্থান নিয়ে দুজন পুনরায় ইয়াবা সেবনে মেতে ওঠেন।
সিদ্ধার্থের দেওয়া জবানবন্দির সূত্রে পুলিশ জানায়, নেশার ঘোরে তারা টেরই পাননি কখন শুভ প্রভাত হয়েছে। পুরো রাতে তারা সর্বমোট আটটি ইয়াবাবড়ি সেবন করেন। অতীতে একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি সেবন করলেও ওই রাতে অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় ইয়াবা সেবনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন সিদ্ধার্থ।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত তথ্য মতে, সকালে গণপতি চক্রবর্তী প্রাতঃভ্রমণ করতে ছাদে এলে তাদের সরাসরি দেখে ফেলেন। উক্ত অবস্থায় তিনি তাদের ধমকের সুরে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’
পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নিজেদের ‘সামাজিক মর্যাদা’ রক্ষার তাগিদে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গলায় থাকা গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে গণপতিকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। হত্যার পর দেহটি ছাদের কোণে পড়ে থাকা টিন দিয়ে ঢেকে দেন।
ঘটনার ধারাবাহিকতায়, গণপতির স্ত্রী ও কন্যা কান্নাকাটির আওয়াজ শুনে ছাদে উঠলে চিৎকার দিতে থাকেন। তৎক্ষণাৎ মুগ্ধ গামছা জড়িয়ে গণপতির স্ত্রীর শ্বাসনালী চেপে ধরেন। অন্যদিকে সিদ্ধার্থ এক হাত দিয়ে কন্যার গলা ও অন্য হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরেন।
স্ত্রী প্রাণ হারানোর পর একই গামছা দুই আসামি মিলে মেয়েটির গলায় পেঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন। তাতেও কাজ না হওয়ায় পাশেই থাকা কবুতরের খাবার রাখার পাত্র থেকে রশি এনে গলায় পেঁচিয়ে দুপাশ থেকে জোরে টান দিয়ে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
পুলিশ প্রধান যুক্ত করেন, এরপর তারা ভবনের ভেতরে ঢুকে দেখেন গণপতির ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন। সিদ্ধার্থকে দেখে প্রিয়ম বলে ওঠে, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’
আদালতকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জানাজানির ভয়ে প্রিয়মকেও গলায় কাপড় পেঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
কমিশনার আরও জানান, চার প্রাণ সংহারের পর সিসিটিভির মাধ্যমে শনাক্ত হওয়ার ভয়ে আসামিরা ছাদে থাকা একটি পুরোনো প্লাস দিয়ে বসতবাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে গণপতির দেহ টিন দিয়ে এবং স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদের সিঁড়িঘরের গেটের আড়ালে গোপন করা হয় যাতে আশেপাশের ভবনের লোকজনের চোখে না পড়ে।
নৃশংস ঘটনার পর দুই আসামি পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে গোসল সম্পন্ন করেন এবং কাছে থাকা সর্বশেষ ইয়াবাবড়িটি সেবন করেন।
পুলিশ উল্লেখ করে, এই ঘটনাকে চুরি কিংবা ডাকাতি বলে সাজানোর কূটবুদ্ধি আঁকেন মুগ্ধ। কৌশলস্বরূপ ঘরের ড্রয়ার টেনে ভেতরের জিনিসপত্র ছিটকে ফেলা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, মুগ্ধ ভেতর থেকে অলংকার এনে দিলে সিদ্ধার্থ তা প্লাস্টিকের কৌটা ও কাপড়ের ব্যাগে গুছিয়ে নেন। পরবর্তীতে তারা ঘর থেকে নগদ ১৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।
জুমার নামাজের সময় হলে আসামিরা গণপতির ছাদ দিয়ে দেবুদের ছাদে যান এবং দেয়াল পার হয়ে স্থান ত্যাগ করেন। উদ্ধারকৃত টাকা মুগ্ধের কাছে এবং স্বর্ণালংকার সিদ্ধার্থের কাছে রাখা হয় এবং তা লুকানোর চেষ্টা চলে।
পরবর্তীতে সিদ্ধার্থ মুগ্ধর কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা সংগ্রহ করেন। ওই অর্থ দিয়ে তিনি বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে আনেন বলে জানায় পুলিশ।
পুলিশ কমিশনার উল্লেখ করেন, গ্রেপ্তারকৃত অপর অভিযুক্ত মুগ্ধ দাসও বিচারকের কাছে অবিকল জবানবন্দি দিয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের রক্তে মাদকের প্রভাব (ডোপ টেস্ট) ও ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে মহানগর পুলিশ জানিয়েছে। আদালতের অনুমোদনক্রমে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কার্যক্রম সম্পন্ন হচ্ছে।
কমিশনার জানান, নারকীয় এই হত্যাকাণ্ডের সময় প্রাণ বাঁচানোর আর্তচিৎকার শুনেছিলেন এক প্রতিবেশিনী। উক্ত নারী তাৎক্ষণিক পুলিশকে খবর দেন। তবে পুলিশকে অবগত করার অপরাধে ঐ নারীর স্বামী তাকে মারধর করেন বলেও প্রকাশ করা হয়।
উক্ত ঘটনায় সীমান্ত দাস এবং দখিগঞ্জ শ্মশানের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিদ্যুৎ দাসের জবানবন্দিও ১৬৪ ধারায় লিপিবদ্ধ হয়েছে। সকল জবানবন্দি, ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত নমুনা ও প্রমাণের সাপেক্ষে মামলাটি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ময়নাতদন্ত রিপোর্টের বরাতে পুলিশ জানায়, ভিকটিম চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করার সত্যতা মিলছে।
নিহত নারী ও কন্যা, আগামী চক্রবর্তী ও প্রীতিলতা চক্রবর্তীর দেহের ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। ল্যাব টেস্টে ধর্ষণের কোনো ইঙ্গিত মেলেনি বলে নিশ্চিত করা হয়।
শ্বাসরোধের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে কমিশনার জানান, গলায় ফাঁস বা শ্বাসনালী চেপে ধরলে মরদেহ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বীর্য ও মলমূত্র নিঃসরণ হতে পারে। এটি বহিরাগত কারো বীর্য নয়, বরং শরীরের ভেতরের স্বাভাবিক জৈবিক ক্রিয়া। অনুরূপভাবে গলায় চাপ পড়লে চোখ বাইরের দিকে উঠে আসার মতো শারীরবৃত্তীয় লক্ষণ দেখা দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ প্রধানের প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ শেষে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা তদন্তের গতিপ্রকৃতি ও হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট মূল উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলেন। অল্প দু-একটি জিজ্ঞাসার জবাব প্রদান করে বাকি প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই স্থান ত্যাগ করেন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন