ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক আমদানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে উল্লেখযোগ্য সংকোচন দেখা দিয়েছে। তবে বাজারের এই নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত রয়েছে।
চীন ও ভারতের রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে তুলনামূলক কম। বিপরীতে নতুন অর্ডার ও বাজার অংশীদারি বাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া।
মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি হয়েছে তিন হাজার ৫০৯ কোটি ডলারের। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ৮.০৪ শতাংশ কম। একই সময়ে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৮.৫০ শতাংশ।
এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানি হয়েছে ৪০১ কোটি ডলারের। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ৫.৭৫ শতাংশ। তবে মার্কিন বাজারের সামগ্রিক সংকোচনের তুলনায় বাংলাদেশের পতন কম হওয়ায় দেশটির অবস্থান এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভোক্তা ব্যয় হ্রাস এবং মার্কিন খুচরা বিক্রেতাদের সতর্ক ক্রয়নীতি এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। তার পরও বাংলাদেশের পতন তুলনামূলক সীমিত থাকায় দেশটির প্রতিযোগিতা সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দিক ফুটে উঠেছে।’
জুনে ফিরেছে প্রবৃদ্ধি
প্রথম ছয় মাসের সামগ্রিক হিসাব নেতিবাচক হলেও জুনে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, জুনে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানি হয়েছে ৭৬ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের, যা ২০২৫ সালের একই মাসের তুলনায় ৫.৭৪ শতাংশ বেশি। রপ্তানিকারকদের মতে, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে নতুন অর্ডার বাড়লে এই প্রবৃদ্ধির ধারা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা চীনের
মার্কিন বাজারে পোশাক রপ্তানিতে সবচেয়ে বড় পতনের মুখে পড়েছে চীন। জানুয়ারি-জুন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩৭.৬৯ শতাংশ। পরিমাণের হিসাবে এই পতন ২৬.৩০ শতাংশ।
একসময় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের একক আধিপত্য থাকলেও এখন সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। ঝুঁকি কমাতে মার্কিন ক্রেতারা তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় করছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে চীনের অংশ ক্রমেই কমছে।
ভারতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। দেশটির রপ্তানি কমেছে ২৫.২৭ শতাংশ। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান প্রতিযোগীদের মধ্যে বাংলাদেশ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।
সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়া
মার্কিন বাজার সংকুচিত হওয়ার পরও কয়েকটি দেশ রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে কম্বোডিয়া। দেশটির রপ্তানি বেড়েছে ১২.৩২ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি বেড়েছে ৩.৪০ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ১.০৮ শতাংশ।
পরিমাণের হিসাবেও একই ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। কম্বোডিয়ার প্রবৃদ্ধি ১৪.৫৯ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ১০.৮৯ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ৩.৩০ শতাংশ।
মূল্য প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে
ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, অর্ডার ধরে রাখতে বেশির ভাগ দেশই ইউনিট মূল্য কমিয়েছে। বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের ইউনিট মূল্য কমেছে ২.১৫ শতাংশ। কম্বোডিয়ার কমেছে ১.৯৮ শতাংশ। পাকিস্তানের ৫.৬৩ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ৬.৭৫ শতাংশ কমেছে।
সবচেয়ে বেশি কমেছে চীনের ইউনিট মূল্য, প্রায় ১৫.৪৬ শতাংশ। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে ওঠার বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চীনের হারানো বাজারের একটি অংশ বাংলাদেশ পাচ্ছে। তবে এই সুযোগের পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তাদের মতে, উচ্চমূল্যের এমএমএফ পণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, ডিজাইন সক্ষমতা এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, বন্দর কার্যক্রম ও লজিস্টিক সেবার উন্নয়নও জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বাংলাদেশ এখনো বড় ধরনের ধস এড়াতে সক্ষম হয়েছে। তবে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে বাজারের অংশীদারি বাড়াতে হলে এখনই উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।
সোর্স: কালের কণ্ঠ










কমেন্ট করুন