Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি

আলু সংরক্ষণেই কৃষকের গুনতে হচ্ছে আড়াই হাজার কোটি টাকা, ভাড়া নিয়ে মুখোমুখি কৃষক-হিমাগার মালিক

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:

আলু সংরক্ষণের জন্য কৃষকদের নির্ভর করতে হয় বাণিজ্যিক হিমাগারের (কোল্ড স্টোরেজ) ওপর। কিন্তু দেশে উৎপাদিত আলুর তুলনায় কোল্ড স্টোরেজের সক্ষমতা রয়েছে অনেক কম। এমন পরিস্থিতিতে শুধু কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণ বাবদই এক মৌসুমে ব্যয় হচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সংগঠনের তথ্যমতে, গত মৌসুমে দেশের ৩৫১টি কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা হয় প্রায় ৩৪ লাখ টন আলু।

সরকার নির্ধারিত কেজিপ্রতি ছয় টাকা ৭৫ পয়সা ভাড়া হিসাবে এই পরিমাণ আলু সংরক্ষণে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় দুই হাজার ২৯৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ শুধু হিমাগারের সংরক্ষণ ভাড়া হিসেবেই কৃষক ও ব্যবসায়ীদের গুনতে হচ্ছে এই বিপুল অঙ্কের টাকা। পরিবহন, বস্তা, লোডিং-আনলোডিং, বাছাই ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে আলু সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের মোট ব্যয় দাঁড়ায় আরও বেশি।

তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৪০০টির বেশি বাণিজ্যিক কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে, যেগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টন। এর মধ্যে বেশির ভাগই বেসরকারি মালিকানাধীন, আর এসব কোল্ড স্টোরেজের ৯৩ থেকে ৯৭ শতাংশই ব্যবহৃত হয় আলু সংরক্ষণে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অধীনে বীজ আলু প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের জন্য সারা দেশে রয়েছে ৩০টি কোল্ড স্টোরেজ, তবে এসবে শুধু সরকারিভাবে আলুবীজ রাখা হয়। গত মৌসুমে দেশে এক কোটি ১০ লাখ টনেরও বেশি আলু উৎপাদিত হয়েছিল বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে খাদ্য ও বীজ হিসেবে আলুর বার্ষিক চাহিদা ৮০ থেকে ৯০ লাখ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে প্রতিবছরই উদ্বৃত্ত থেকে যায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আলু। গত মৌসুমে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ছিল প্রায় ২০ লাখ টনেরও বেশি। সংরক্ষণ সক্ষমতা উৎপাদনের তুলনায় কম হওয়ায় মৌসুমের শুরুতেই বাজারে বেড়ে যায় আলুর সরবরাহ, যা কৃষক পর্যায়ে দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, কোল্ড স্টোরেজে রাখাসহ কৃষকের প্রতি কেজি আলুর খরচ পড়ে ১৮ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে অনেক এলাকায় কৃষকরা এর চেয়েও কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে উৎপাদন ভালো হলেও কৃষকের লাভ নিশ্চিত হচ্ছে না।

ভাড়া নিয়ে কৃষকের ক্ষোভ

আলু সংরক্ষণের খরচ নিয়ে কয়েক বছর ধরেই কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন গত বছর হিমাগারে আলু রাখার ভাড়া কেজিপ্রতি আট টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যার প্রতিবাদ জানান কৃষকরা। এর প্রেক্ষিতে সরকার গত বছর কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণের সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় কেজিপ্রতি ছয় টাকা ৭৫ পয়সা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হিমাগার ভাড়া বেড়ে গেলে এর প্রভাব শুধু কৃষকের ওপরই পড়ে না, শেষ পর্যন্ত তা গিয়ে ঠেকে খুচরা বাজারেও। কারণ সংরক্ষণ, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় যোগ হয়েই বাড়ে আলুর বিক্রয়মূল্য। গত আগস্ট মাসে সংবাদ সম্মেলন করে আলু চাষিরা আগামী মৌসুমে হিমাগারভাড়া কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ চার টাকা নির্ধারণের দাবি জানান। ওই সংবাদ সম্মেলনে রাজশাহীর চাষিরা অভিযোগ তোলেন, হিমাগার মালিকরা অযৌক্তিকভাবে আবারও আলু সংরক্ষণে ভাড়া বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। এমন অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধিতে চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলেও জানান তারা। তাদের ভাষ্যে, আলু বিক্রি করে চাষিরা লাভ তো করতেই পারছেন না, বরং হিমাগারভাড়া মেটাতেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় আলুর হিমাগার পরিচালনা অসম্ভব বলে দাবি করছেন মালিকরা। তাদের হিসাবে, প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে খরচ দাঁড়ায় সাত টাকা ১১ পয়সা। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাফা আজাদ চৌধুরী বাবু কালের কণ্ঠকে বলেন, “আগে ভাড়া ছয় টাকা ৭৫ পয়সা ছিল। সম্প্রতি আবার সেটি কমিয়ে করা হয়েছে ছয় টাকা। ২৫টি জেলার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন খরচ হিসাব করে এই টাকা কমানো হয়েছে।” এতে মালিকরা ১৭২ কোটি টাকা থেকে বঞ্চিত হবেন বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, “ভাড়া কমানোর জন্য আমাদের কোল্ড স্টোরেজের ওপর হামলা করা হচ্ছে। আমাদের বাধ্য করা হচ্ছে। আমরা নিরুপায়।” ৩৪ লাখ টনের মধ্যে এখনো ২৩ লাখ টন আলু কোল্ড স্টোরেজে মজুত রয়েছে বলেও জানান তিনি। তার কথায়, “লোকসান দিয়ে তো আমরা ব্যবসা করতে পারব না।”

হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া কেজিপ্রতি ৭৫ পয়সা কমিয়ে ছয় টাকা নির্ধারণ করায় প্রায় ১৭২ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়ার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, চলতি বছর হিমাগারশিল্পে বিদ্যুতের দাম ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও মৌসুমের মাঝপথে এসে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর তড়িঘড়ি করে ভাড়া কমিয়ে দিয়েছে। আয় কমে যাওয়ায় মালিকরা ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে পারবেন না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। এর ফলে অনেক হিমাগার বন্ধ হয়ে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে তারা।

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন