Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি

শক্তিশালী এল নিনোর বিদায়ের পর এবার প্রলয়ঙ্কারী লা নিনার রূপ চাক্ষুষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্ব

ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্বব্যাপী অস্বাভাবিক আবহাওয়ার প্রেক্ষাপটে পুনরায় বড় আলোচনার জন্ম দিচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের জলবায়ু চক্র ‘এল নিনো’। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, রেকর্ড বৃষ্টিপাত, তীব্র খরা ও অস্বাভাবিক ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক পরিস্থিতির নেপথ্যে প্রভাব ফেলছে সমুদ্রের এই বিশেষ জলবায়ু পরিবর্তন। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করে জানিয়েছে, বর্তমান এল নিনোর ক্ষতিকর প্রভাব এখনো চরম সীমায় পৌঁছায়নি এবং ২০ ২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এর বিধ্বংসী প্রভাব অব্যাহত থাকার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
তবে প্রাথমিক পূর্বাভাস বলছে, এল নিনোর জোর প্রভাব কমতে শুরু করার সাথে সাথেই প্রশান্ত মহাসাগরের আবহাওয়ার সমীকরণে বিশাল এক পরিবর্তনের সূচনা ঘটবে। সাগরের পানির এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়ে এর বিপরীত রূপ অর্থাৎ ‘লা নিনা’ পরিস্থিতির জন্ম হতে পারে। অবশ্য এল নিনোর পরপরই যে নিশ্চিতভাবে লা নিনা হাজির হবে, তেমন সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা এখনো পাননি আবহাওয়াবিদরা। বিজ্ঞানীরা জানান, প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রার পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতির ওপরই মূলত নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ জলবায়ুর গতিপথ।
এল নিনো ও লা নিনার আদ্যোপান্ত এল নিনো ও লা নিনা মূলতঃ একই প্রাকৃতিক জলবায়ু ব্যবস্থার দুটি বিপরীতমুখী পর্যায়। সাধারণত প্রতি তিন থেকে সাত বছর পর পর প্রশান্ত মহাসাগরে এরূপ বিপরীতমুখী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (এনওএএ) এই সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে ‘এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন’ বা সংক্ষেপে ‘এনসো’ (ENSO) নামে অভিহিত করে থাকে।
স্প্যানিশ ভাষায় ‘এল নিনো’ শব্দের শাব্দিক অর্থ ‘ছোট ছেলে’ এবং ‘লা নিনা’ বলতে বোঝায় ‘ছোট মেয়ে’।
উৎপত্তিস্থল প্রশান্ত মহাসাগর হলেও এই দুই রূপের ক্ষতিকর প্রভাব মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। এর প্রভাবে নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে আকস্মিক বৃষ্টিপাত ও বন্যার প্রাদুর্ভাব ঘটে, কোথাও দেখা দেয় প্রলয়ঙ্কারী খরা, আবার কোনো অঞ্চলে সামুদ্রিক ঝড়ের তীব্রতা বহুলাংশে পরিবর্তিত হয়। বিশেষভাবে এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মহাদেশীয় আবহাওয়ায় এর ব্যাপক ঋণাত্মক রূপ পরিলক্ষিত হয়।
যেভাবে ঘটে আবহাওয়ার পরিবর্তন সাধারণত ‘এল নিনো’ হলো এনসো ব্যবস্থার অতি-উষ্ণ পর্যায়। এই সময়টায় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বমুখী বাতাস বা বাণিজ্য বায়ু প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিমাত্রায় উষ্ণ পানি সঞ্চিত হতে থাকে, যা বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ও বিশ্বব্যাপী বৃষ্টিপাতের চিরচেনা ধরন এক নিমেষে বদলে দেয়।
অপরদিকে ‘লা নিনা’ হলো ঠিক এর বিপরীত শীতল মেরু। এ সময় বাণিজ্য বায়ু স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী রূপ ধারণ করে। ফলে উপরিভাগের উষ্ণ পানি প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার উপকূলের দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়। একই সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ঘেঁষে সমুদ্রের তলদেশ থেকে শীতল ও নানা পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি উপরিভাগে উঠে আসে।
ফলশ্রুতিতে বৈশ্বিক পরিসরে একযোগে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও ঘুর্ণিঝড়ের গতিপথে বড় ধরনের ওলটপালট ঘটে।
এল নিনোর পর কি লা নিনার আগমন সুনিশ্চিত? বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, এল নিনো ও লা নিনা একই জলবায়ু চক্রের অংশ হলেও এদের একটির বিদায়ের ঠিক পরপরই অন্যটির আগমন ঘটবে—এমন নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম বা সময়সূচি নেই। ক্ষেত্রবিশেষে এল নিনোর প্রাদুর্ভাব শেষে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ পরিস্থিতি বিরাজ করতে পারে, আবার কখনও লা নিনা টানা কয়েক বছর ধরেও স্থায়ী রূপ নিতে পারে।
ডব্লিউএমওর পরিসংখ্যান ও পূর্বাভাস নির্দেশ করে যে, ২০ ২৫ সালের শেষ ভাগে তৈরি হওয়া দুর্বল মানের লা নিনাটি ২০ ২৬ সালের শুরুতেই পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এরপর সেই বছরের মাঝামাঝি সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের সমীকরণ আচমকা বদলে গিয়ে তুলনামূলক শক্তিশালী এল নিনোর জন্ম দেয়।
এনওএএর জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ নাথানিয়েল জনসন ২০ ২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত এক পরীক্ষামূলক নিবন্ধে দাবি করেন, বর্তমানের বলীয়ান এল নিনোটি ২০ ২৭ সালের বসন্তকাল অথবা গ্রীষ্মের গোড়ার দিকে এনসো-নিরপেক্ষ সাধারণ অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করতে পারে। যদিও সময় যত গড়াবে, পূর্বাভাসের এই নির্ভুলতা নিয়ে অনিশ্চয়তা ততটাই বৃদ্ধি পাবে।
২০২৭ সালে বিশ্বের সম্ভাব্য মুখোমুখি অবস্থান চলতি এল নিনো শক্তি হারিয়ে নিস্তেজ হওয়ার পর লা নিনা দানা বাঁধার ব্যাপক সম্ভাবনা স্পষ্ট হলেও, বিজ্ঞানীরা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে রাজি নন। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ও আচরণ কীভাবে বদলাচ্ছে, তা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বিশ্বের শীর্ষ আবহাওয়াবিজ্ঞানীরা।
তবে বাস্তবিকই যদি লা নিনা আবির্ভূত হয়, তবে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার বিন্যাস নতুন করে নাটকীয় রূপ নেবে। কোথাও আকস্মিক প্রবল বর্ষণ ও ঢল দেখা দেবে, তো কোথাও দেখা দেবে চরম শুষ্কতা। স্বভাবতই এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কোপ গিয়ে পড়বে বৈশ্বিক কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থার ওপর।
সূত্র: এনডিটিভি

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন