Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি

ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়াল অর্থ মন্ত্রণালয়, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি নিয়ে সতর্কতা

ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস upward revision (ঊর্ধ্বমুখী সংশোধন) করেছে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়। নতুন মূল্যায়ন অনুযায়ী, আলোচ্য অর্থবছরে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে দেশটির প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ।
তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ইতিবাচক হলেও জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে বিশেষ সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছে মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি প্রকাশিত ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। ভারতের অর্থবছরের হিসাব ১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে পরের বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বলবৎ থাকে।
অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে ইতিবাচক ধারা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস যেখানে প্রায় ৩ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলক বেশ শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিগত প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতির একাধিক মৌলিক সূচকে দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—জ্বালানির অভ্যন্তরীণ ব্যবহার, সামুদ্রিক বন্দরে পণ্য পরিবহন, পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) আদায় এবং গাড়ির বিক্রি বৃদ্ধি। এই ইতিবাচক প্রবণতাগুলো ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি আরও সম্প্রসারিত হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জ্বালানি ও খাদ্যের চড়া দামে মূল্যস্ফীতির শঙ্কা প্রবৃদ্ধির গতি ঊর্ধ্বমুখী হলেও মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ রয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতি এবং বৈরী আবহাওয়া দেশটির অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানির চড়া মূল্য ভারতীয় রুপির বিনিময় মূল্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এর ফলশ্রুতিতে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের ভোক্তা মূল্যসূচকভিত্তিক (সিপিআই) মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশে। একই সময়ে পাইকারি মূল্যসূচকভিত্তিক (ডব্লিউপিআই) মূল্যস্ফীতির হার লাফিয়ে বেড়ে ১১ দশমিক ৩৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এছাড়া খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির হার গ্রামাঞ্চলে ৮ শতাংশ এবং শহর অঞ্চলে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম। গত সেপ্টেম্বর মাসে এই খাতে মূল্যস্ফীতির হার রেকর্ড ২৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে শহুরে ও গ্রামীণ পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
এল নিনোর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সতর্কতা মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি সম্ভাব্য ‘এল নিনো’র প্রভাবে কৃষি খাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এল নিনোর জেরে শীতকালীন ফসলের বপন মৌসুম শুরুর আগেই কৃষিজমির মাটির আর্দ্রতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেতে পারে, যা দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদনকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রুপির দরপতন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত পাঁচ বছর ধরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রার মান ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে এবং সাম্প্রতিক প্রায় ১৫ মাসে এই পতনের গতি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তবে স্বস্তির বিষয় হলো, ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৭২১ বিলিয়ন ডলারে অবস্থান করছে। পর্যাপ্ত এই রিজার্ভ থাকায় যেকোনো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা এবং মুদ্রার মান ধরে রাখতে ভারত বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে দাবি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
সার্বিকভাবে চলতি অর্থবছরে ভারতের প্রবৃদ্ধি নিয়ে জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করা হলেও জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বৈশ্বিক নানা অনিশ্চয়তা সফলভাবে মোকাবিলা করাই এখন দেশটির অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: ডয়চে ভেলে (ডিডব্লিউ), রয়টার্স ও ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন