ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
কাতার বিশ্বকাপের আগে লিওনেল মেসির চাওয়াটা ছিল অনেকটা কবির সুমনের সেই বিখ্যাত গানের মতোই। ব্যক্তিগত সব শিরোপা ঘরে তুললেও বিশ্বকাপ ট্রফিটা ছিল অধরা। অবশেষে ২০২২ সালে ফ্রান্সকে হারিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ হয় আর্জেন্টিনার অধিনায়কের। ৩৬ বছর পর তৃতীয়বার বিশ্বকাপ নিশ্চিত হতেই ধারাভাষ্যকার পিটার ডুরির কণ্ঠে ভেসে আসে, “শেষ চূড়া জিতে অমরত্বের স্বাদ পেয়েছে মেসি।”
তবু থামেননি তিনি। ক্যারিয়ারের গোধূলিতে আজন্ম স্বপ্ন পূরণের পরও কেন আরেকটি বিশ্বকাপে নামছেন মেসি? উত্তর একটাই, ক্ষুধা। সাবেক সতীর্থ আনহেল দি মারিয়ার সঙ্গে বুটজোড়া তুলে রাখার সুযোগ ছিল। কিন্তু ক্যারিয়ারের শেষটা রাঙিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন ৮বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী। আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ পাবলো আইমারে, যিনি মেসির শৈশবের আইডল, বলেছেন, “সর্বশেষ মেসিই সেরা মেসি।”
বয়সের সঙ্গে খেলার ধরনেও পরিবর্তন এনেছেন মেসি। বনের রাজা সিংহ যেভাবে কৌশলে শক্তি সঞ্চয় করে, ঠিক তেমনি মাঠে কম দৌড়ে খেলার নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিচ্ছেন তিনি। পজিশনেও বদল এসেছে। মাঝমাঠ ছেড়ে এখন একটু উপরে খেলেন ইন্টার মায়ামির অধিনায়ক, যেন সঠিক মুহূর্তে সর্বোচ্চ প্রভাব রাখতে পারেন।
বিশ্বকাপের জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছেন মেসি, এটি নিশ্চিত করেছেন সতীর্থ মিডফিল্ডার রদ্রিগো দি পল। তিনি বলেছেন, “আমরা বিশ্বকাপের জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছি। গত দুই-তিন মাস ধরে ক্লাবের অনুশীলনের পাশাপাশি আমরা প্রতিদিন আলাদা অনুশীলন করছি। সেরা ফিটনেসের জন্যই লিও এবং আমি সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিচ্ছি। বিশ্বকাপের ভাবনা ছাড়া কি আর থাকা যায়।”
বিশ্বকাপ জয়ের পর মানসিকভাবে অনেকটা চাপমুক্ত মেসি। কোচ লিওনেল স্কালোনিও তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দলকে আরও স্বনির্ভর করে তুলেছেন। কাতার বিশ্বকাপে খেলা তরুণরা এখন পরিণত। ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের প্রমাণ করছেন তারা। কনমেবলের বাছাইপর্বে সর্বোচ্চ ৩৮ পয়েন্ট এনেছে দলটি। এমনকি সর্বশেষ কোপা আমেরিকার ফাইনালে অর্ধেকেরও বেশি সময় মেসিকে ছাড়াই খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্জেন্টিনা। ২০২২ বিশ্বকাপে খেলা ১৬ জন এবারও স্কোয়াডে থাকায় দলীয় বোঝাপড়া আগের চেয়ে আরও পোক্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পরিচিত পরিবেশও আর্জেন্টিনার পক্ষে কাজ করবে। সর্বশেষ কোপা আমেরিকা জিতেছিল ট্রাম্পের দেশেই। মেসি গত ৩ বছর ধরে ইন্টার মায়ামিতে খেলছেন, গত বছর দি পলকেও এনেছেন একই ক্লাবে। ফলে অনেকটা ঘরের মাটিতেই খেলবেন তারা।
রেকর্ডের হাতছানিও কম নেই মেসির সামনে। চ্যাম্পিয়ন হলে বিশ্বের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে দুইবার বিশ্বকাপ জেতার ইতিহাস গড়বেন তিনি। সবচেয়ে বেশি ২৬ ম্যাচ খেলার রেকর্ড তার আগেই আছে। মাত্র ৪ গোল করলেই জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের বিশ্বকাপ রেকর্ড নিজের করে নেবেন তিনি। টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের নজির এখন পর্যন্ত শুধু ইতালি (১৯৩৪ ও ১৯৩৮) ও ব্রাজিলের (১৯৫৮ ও ১৯৬২)। জিততে পারলে সেই বিরল তালিকায় নাম উঠবে মেসিরও। এখন পর্যন্ত ব্রাজিল ও ইতালি মিলিয়ে ১৮ জন খেলোয়াড় এই কীর্তি গড়েছেন, যার মধ্যে পেলে একমাত্র ফুটবলার হিসেবে সর্বোচ্চ ৩বার বিশ্বকাপ জিতেছেন।
অনুপ্রেরণার গল্পও আছে। বার্সেলোনায় মেসির সঙ্গে জুটি বেঁধে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা হয়নি উসমান দেম্বেলের। অথচ পিএসজির হয়ে টানা দুইবার সেই ট্রফি জিতেছেন তিনি। ক্রিকেটেও মিলছে একই গল্প। বিরাট কোহলি জাতীয় দলের হয়ে সবকিছু জিতলেও আইপিএল ট্রফি ছিল অধরা। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে ২০২৫ সালে রয়্যাল চালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে প্রথমবার জেতেন এবং এ বছর সেই ট্রফি ধরেও রেখেছে তার দল। দেম্বেলে ও কোহলির পর এবার পালাটা মেসির।
নিজেও আত্মবিশ্বাসী আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। তিনি বলেছেন, “আমরা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন, ধরে রাখার সুযোগ পাওয়াটা তাই দারুণ এক ব্যাপার। জাতীয় দলের হয়ে খেলা সবসময় স্বপ্নের, বিশেষ করে অফিসিয়াল টুর্নামেন্টগুলোতে। আশা করি, ঈশ্বর আমাকে আরও একবার এমনটা করার সুযোগ দেবেন।”
আর্জেন্টিনার সাবেক ডিফেন্ডার পাবলো জাবালেতাও মেসির বিশ্বকাপ জয়ে আস্থাশীল। তার কথায়, “আমাদের মেসির খেলা উপভোগ করা উচিত। কারণ এটিই হতে পারে তার শেষ বিশ্বকাপ। আশা করি, ম্যাচ এবং বিশ্বকাপ জয়ের জাদুকরী মুহূর্ত তার মধ্যে এখনও বাকি আছে।”
অসম্ভবকে সম্ভব করার দীর্ঘ ইতিহাস আছে মেসির। তাই এবারও পারবেন, এই বিশ্বাস কোটি ভক্তের মনে।










কমেন্ট করুন