ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
মন্দার কবলে পড়া দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনিবাসী বিনিয়োগকারীদের প্রতিটি শেয়ার লেনদেনে অডিটরের সনদ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিল করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আজ (২০ মে) জারি করা নতুন সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনিবাসী বিনিয়োগকারী টাকা অ্যাকাউন্টের (এনআইটিএ) কর আদায় প্রক্রিয়া সহজ করে দিয়েছে। নতুন নিয়মে শেয়ার বিক্রির অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাকাউন্টে জমা হবে এবং ব্যাংক নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য কর কেটে রাখবে।
আগের নিয়মে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতিটি লেনদেনের পর মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন্স ট্যাক্স) নির্ধারণে একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সনদ সংগ্রহ করতে হতো। সেই সনদ পাওয়ার পরই কেবল বিক্রয়লব্ধ অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ বা বিদেশে প্রেরণ করা যেত। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সময় ও অর্থ দুটোই বেশি খরচ হতো এবং সক্রিয় লেনদেনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতো।
নতুন নিয়ম যেভাবে কার্যকর হবে
নতুন সার্কুলার অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো এখন থেকে অনিবাসী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বা সিকিউরিটিজ বিক্রির অর্থ থেকে সরাসরি মূলধনী মুনাফা কর কেটে রাখবে। বিক্রয়লব্ধ অর্থ সংশ্লিষ্ট এনআইটিএ অ্যাকাউন্টে জমা হবে এবং বিদেশে পাঠানোর আগে কর্তিত কর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে আলাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আগের পদ্ধতিতে অনিবাসী বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনতেন এবং বিক্রি করে মুনাফা করতেন। তারপর কর কাটার পর বাকি অর্থ অ্যাকাউন্টে জমা হতো। পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে অনেকে আপত্তি জানিয়েছিলেন, কারণ এতে প্রায় ১৫ দিনের মতো সময় লাগত। কর হিসাব করে সার্টিফিকেট নেওয়া থেকে নানা কার্যক্রমে অনেক সময় লাগত।
তিনি আরও বলেন, “এখন যে নিয়ম করা হয়েছে তা হলো—শেয়ার বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে সেই অর্থ অ্যাকাউন্টে জমা করতে পারবে। তবে বাংলাদেশ থেকে বাইরে বা বিদেশে নেওয়ার সময় ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স ও শেয়ার বিক্রিতে কত লাভ করল— সেটা আলাদা রেখে বাকি টাকা প্রত্যাবাসন করতে পারবে। তাহলে অ্যাকাউন্টে সঙ্গে সঙ্গে ক্রেডিট হয়ে যাবে। তখন উক্ত বিনিয়োগকারী চাইলে আবার শেয়ার কিনতে পারবে। কিন্তু অ্যাকাউন্টে জমা হতে ৩০ দিন সময় লাগলে— শেয়ারবাজারে পুনঃবিনিয়োগ করতে তার আরো বেশি সময় লাগবে। এখন পুনঃবিনিয়োগ করতে কম সময় লাগবে, তাতে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ আনার জন্য উৎসাহ প্রদান করা হল।”
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এই অনুমোদন দিয়েছে।
দীর্ঘদিনের বাধার অবসান
সিটি ব্রোকারেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মিসবাহ উদ্দিন আফান ইউসুফ টিবিএসকে জানান, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি বহু বছরের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “আগে ছোটখাটো লেনদেনের জন্যও ক্লায়েন্টদের ম্যানুয়ালি একটি সিএ (চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট) সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে কাস্টোডিয়ান ব্যাংকে জমা দিতে হতো। কেপিএমজি-র মতো বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এটি পরিচালনা করতে পারলেও, ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি ছিল একটি দুঃস্বপ্ন।”
ইউসুফ আরও বলেন, “এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূলত স্বাধীনভাবে লেনদেন করতে পারতেন না। এখন ব্যাংক নিজেই ১৫% মূলধনী মুনাফা কর গণনার বিষয়টি দেখবে এবং শুধুমাত্র বিদেশে অর্থ পাঠানোর সময় সার্টিফিকেট ইস্যু করবে। এটি একটি বিশাল স্বস্তি, যা নির্বিঘ্নে লেনদেনের সুযোগ করে দেবে।”
এই পদক্ষেপকে বাজারের জন্য একটি “মৌলিক পরিবর্তন” আখ্যা দিয়ে স্বাগত জানিয়েছেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “মূলধনী মুনাফা কর চালুর পর থেকে ‘এনআইটিএ’ লেনদেন সহজ করার জন্য ডিএসই এবং ডিবিএ একাধিকবার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে। অবশেষে এই সমস্যার সমাধান হলো। এটি বিদেশি পুঁজির অবাধ প্রবেশ ও প্রত্যাবাসনের বাধা দূর করল, যা বাজারের তারল্য (লিকুইডিটি) বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
সাইফুল ইসলাম আরও জানান, একটি এনআইটিএ অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স তালিকাভুক্ত শেয়ার ও আইপিওতে বিনিয়োগের কাজে ব্যবহার করা যাবে। সহজীকৃত নিয়মে ব্যাংক প্রয়োজনীয় কর কেটে নেওয়ার পর এই অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স, লভ্যাংশ এবং শেয়ার বিক্রির অর্থ সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রায় অবাধে বিদেশে পাঠানো যাবে।
এনআইটিএ যেভাবে কাজ করে
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ গাইডলাইন অনুযায়ী, অনাবাসী বাংলাদেশি (এনআরবি) এবং বিদেশিরা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করে স্থানীয় পুঁজিবাজারে অংশ নিতে পারেন। এ জন্য তাদের দুটি অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়: বৈদেশিক মুদ্রা আনা-নেওয়ার জন্য ফরেন কারেন্সি (এফসি) অ্যাকাউন্ট এবং বৈদেশিক মুদ্রাকে টাকায় রূপান্তর করে শেয়ার কেনার জন্য এনআইটিএ অ্যাকাউন্ট। দেশের যেকোনো অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকে এই হিসাব দুটি খোলা যাবে।










কমেন্ট করুন