ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি পূর্ণ সুস্থ রয়েছেন এবং পূর্ণ কর্তৃত্বের সাথেই রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আব্দুল মজিদ হাকিম ঈলাহি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি অতর্কিত যৌথ হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন এবং তাঁর ছেলে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আহত হন। পিতার মৃত্যুর পর দেশের সার্বিক দায়িত্ব হাতে নিলেও এরপর থেকে মোজতবা খামেনিকে আর প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। তিনি কেবল লিখিত বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছেন। এমনকি জুলাই মাসে সম্পন্ন হওয়া পিতার শেষকৃত্যানুষ্ঠানেও তাঁকে দেখা না যাওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থা ও সম্ভাব্য গুপ্তহত্যার চক্রান্ত ঘিরে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতের নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ‘এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিট ২০২৬’-এ অংশ নিয়ে এনডিটিভির সাথে সাক্ষাৎকারে জ্যেষ্ঠ ইরানি কূটনীতিক আব্দুল মজিদ হাকিম ঈলাহি জানান, গত সপ্তাহে মোজতবা খামেনি দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সাথে ৭ ঘণ্টাব্যাপী এক বৈঠক করেছেন। আব্দুল মজিদ হাকিম ঈলাহি বলেন, “তিনি অত্যন্ত চমৎকার স্বাস্থ্যের অধিকারী এবং খুব সুন্দরভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এমনকি আমাদের প্রেসিডেন্টও উল্লেখ করেছেন যে গত সপ্তাহে তিনি তাঁর সঙ্গে একটি ৭ ঘণ্টার বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া আমাদের পার্লামেন্টের স্পিকার আগামী পরশু এখানে (নয়াদিল্লী) আসবেন। তিনিও গতকাল বলেছেন যে শীর্ষ নেতার সঙ্গে তাঁর বহু ঘণ্টার বৈঠক হয়েছে। আমার এমন কিছু বন্ধু আছেন যারা তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন এবং তাঁরা আমাকে নিশ্চিত করে বলেছেন যে তিনি খুবই সুস্থ আছেন এবং নিজের দায়িত্ব খুব সুন্দরভাবে পালন করছেন।”
পিতার জানাজা ও দাফনে মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতির দাবি খণ্ডন করে তিনি বলেন, “বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে তিনি মিডিয়ার সামনে আসেননি এবং কেউ তাঁকে দেখেনি। কিন্তু তিনি তাঁর বাবার শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছিলেন। ওই সময় আমি ইরানেই ছিলাম। আমি তাঁর দুই ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেছি। মোজতবা খামেনিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “এমনকি কোনো কোনো রাতে তিনি রাস্তায়ও নেমে আসেন। তিনি ইরানের সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলেও অংশ নিয়েছেন এবং বেশ ভালো আছেন।”
ইরানের সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও ভেতরের নানা সূত্র নিশ্চিত করছে যে, হামলাজনিত আঘাত থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পাশাপাশি কড়া নিরাপত্তাজনিত কারণেই খামেনি আপাতত আড়ালে থেকে দেশ শাসন করছেন। একই সাথে তিনি বিশ্বস্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি দলকে দৈনন্দিন কাজ পরিচালনার ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করেছেন।
কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত গুপ্তহত্যার প্রবল আশঙ্কার কারণেই খামেনি প্রকাশ্যে আসা এড়িয়ে চলছেন। তবে তিনি নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক পরিচালনা, প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং প্রতিটি নীতির ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে শীর্ষ পদে আসার আগেও তিনি পিতার প্রধান সহকারী হিসেবে নেপথ্যে থেকেই কাজ পরিচালনা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।
এর আগে গত ২১ জুলাই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছিলেন যে শীর্ষ নেতার সাথে বার্তা আদান-প্রদান বৃদ্ধি পাচ্ছে, যদিও আগস্টের শুরুতে তিনি পুনরায় জানান যে খামেনির সাথে যোগাযোগ রক্ষা অত্যন্ত জটিল। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের সূত্র মতে, জুলাইয়ের শেষের বৈঠকে সামরিক খাতসহ অর্থনীতি, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রা ও জ্বালানি বণ্টন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে অর্থনৈতিক যোগাযোগের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তাছাড়া গত মে মাসেও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছিল যে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান মোজতবা খামেনির সাথে দীর্ঘ বৈঠক করেছিলেন, যা শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার পর তাঁদের প্রথম প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছিল।
চলতি মাসের সূচনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, আট মাসে গড়ানো এই সংঘর্ষের মাঝে ইরান প্রকৃতপক্ষে কার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে তা অনিশ্চিত। ট্রাম্প বলেন, “তাদের নেতারা চলে গেছে, তাদের দ্বিতীয় সারির নেতারাও চলে গেছে এবং আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কেউ জানেই না যে আসলে কোন নরক এই দেশটা চালাচ্ছে।”
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও উল্লেখ করেন, তারা ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সাথে আলোচনা চালু রাখলেও ক্ষমতার চূড়ান্ত রূপরেখা স্পষ্ট নয়। ভ্যান্সের মতে, “আমরা যা বুঝতে পেরেছি, তার মধ্যে একটা বিষয় হলো, তাদের দেশ কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয় তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।”
মার্কিন শীর্ষ প্রশাসনের এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র স্পষ্ট করেছেন যে, ওয়াশিংটনের দায়িত্বশীলরা ইরানের নীতি নির্ধারণী কাঠামো এবং তাঁদের সমকক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ক্ষমতা সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল।










কমেন্ট করুন