Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি

প্রত্যাখ্যাত হয়ে দুই দশক পর প্রতিশোধ: ইতালি গিয়ে প্রেমিকা ও তার পরিবারকে নৃশংস হত্যা

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:

বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ২২ বছর পর ক্ষোভ ও প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে নোয়াখালীর শাহাদাত হোসেন অবৈধ উপায়ে পাড়ি জমান ইতালিতে। ইতালির রাজধানী রোমে গত ২৬ জুন রাতে তিনি তার সাবেক প্রেমিকা, তার স্বামী ও পাঁচ বছরের কন্যাসন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন বলে মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে।

ইতালীয় সংবাদমাধ্যম, স্থানীয় পুলিশ এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ঘাতক শাহাদাত হোসেনের সাথে আরজু আক্তারের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তবে আরজুর পরিবার শাহাদাতের বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে তাকে ইতালিপ্রবাসী কামাল উদ্দিন বাবুলের সাথে বিয়ে দেয়।

বিয়ের পরবর্তীতে স্ত্রী আরজুকে সাথে নিয়ে কামাল উদ্দিন ইতালিতে স্থায়ী হন এবং তাদের দাম্পত্য জীবনে তিন সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু সেই প্রত্যাখ্যাত হওয়া মেনে নেননি শাহাদাত। দীর্ঘ দুই দশক ধরে তিনি আরজুর স্বজনদের খবর সংগ্রহ করে উপযুক্ত সুযোগের প্রতীক্ষায় ছিলেন।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের ২৪ নভেম্বর ইংল্যান্ডে যান শাহাদাত। সেখান থেকে পরবর্তীতে বেআইনিভাবে ইতালির রোমে প্রবেশ করে কৌশলে আরজুর পরিবারের সাথে যোগাযোগ গড়েন। নিজের পরিচয় দেন আরজুর ‘দূর সম্পর্কের আত্মীয়’ হিসেবে। আরজুও সরল বিশ্বাসে পূর্বপরিচিত শাহাদাতকে নিজ গৃহে আসার অনুমতি দেন।

তদন্তকারীদের ধারণা, গত ২৬ জুন রাতে শাহাদাত ওই বাসায় পৌঁছালে কেবল আরজু এবং তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে আরিশাকে দেখতে পান। প্রথমে তিনি আরজুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন। এসময় মাকে রক্ষার চেষ্টা অথবা চিৎকার করায় ফুটফুটে শিশু আরিশাকেও নির্মমভাবে হত্যা করেন তিনি। জোড়া হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে না গিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় মেঝের রক্ত মুছে লাশগুলো লুকিয়ে রাখেন শাহাদাত। তিনি জানতেন একে একে অন্য সদস্যরা ফিরবেন এবং বাকিদেরও মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে অপেক্ষা করতে থাকেন। কিছুক্ষণ বাদে কাজ শেষে স্বামী বাবুল ফিরলে তাকেও উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।

সর্বশেষ ঘরে ফেরা বড় ছেলে আয়ান (২০) পুলিশকে জানান, তিনি প্রবেশ করেই শাহাদাতকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখেন। শাহাদাত তাকে জানান যে তার মা-বাবা ঘুমাচ্ছেন। কিন্তু কক্ষের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় খাটের নিচে ছোট বোন আরিশার পা বেরিয়ে থাকতে দেখে অমঙ্গল আঁচ করেন আয়ান। ঠিক তখনই শাহাদাত ধারালো অস্ত্র নিয়ে তার ওপর হামলা চালান।

আয়ান প্রাণ বাঁচাতে রক্তাক্ত অবস্থায় চিৎকার দিতে দিতে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং প্রতিবেশীদের ডাকেন। তার সেই আত্ম চিৎকারে শাহাদাত ভয় পেয়ে স্থান ত্যাগ করেন।

এই তিন খুনের পর থেকেই পলাতক রয়েছেন শাহাদাত হোসেন। ইতালির সংবাদমাধ্যম ‘ইল মেসাজ্জেরো’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইংল্যান্ডে স্ত্রী-সন্তান থাকায় তিনি হয়তো ইতালি সীমান্ত পেরিয়ে ইংল্যান্ডে বা বাংলাদেশে চম্পট দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পর রোমের প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল শনিবার এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ জানান, নৃশংস এই খুনের তদন্তে ইতালি পুলিশ বাংলাদেশ সরকারের সহায়তা চেয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই ঘটনা বিদেশের মাটিতে আমাদের দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’

ইতালির আরেক সংবাদমাধ্যম ‘ফ্যানপোস্ট’ জানিয়েছে, শাহাদাতের আত্মহত্যার আশঙ্কাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। কারণ হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পূর্বে নিজের ফেসবুকে কিশোর কুমারের ‘মেরা জীবন কোরা কাগজ’ গানটি পোস্ট করে এক রহস্যময় বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। যেখানে শাহাদাত লিখেছিলেন, ‘একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকে মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারো জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।’

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন