Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি

দুর্বিষহ ঢাকায় দিনে প্রায় ৪ কোটি মানুষের যাতায়াত, বাসযোগ্যতার সূচকে অবস্থান ১৭১তম

ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানী ঢাকায় ছুটে আসছে মানুষ। কেউ আসছেন চাকরির সন্ধানে, কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে, আবার কেউ উচ্চশিক্ষা কিংবা উন্নত চিকিৎসার আশায়। জীবিকার তাগিদে ঢাকামুখী মানুষের এই নিরবচ্ছিন্ন স্রোত প্রতিনিয়ত বড় করছে রাজধানীর জনসংখ্যা।
অথচ সেই অনুপাতে বাড়ছে না সড়ক, গণপরিবহন, আবাসন, পয়োনিষ্কাশন কিংবা প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা। ফলে সীমিত আয়তনে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস ও যাতায়াতে ঢাকা পরিণত হয়েছে এক দুর্বিষহ নগরীতে। এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব নগর দিবস’, যার এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নগর পুনরুজ্জীবন: সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশনের প্রায় ৩০৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১ কোটি ২৮ লাখের বেশি মানুষ বাস করছেন। সে হিসাবে প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে বসবাস করছেন প্রায় ৩৩ হাজার ৫০০ জন। ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা এবং ২০২৩ সালের হাউসহোল্ড ইন্টারভিউ সার্ভের তথ্য মতে, বৃহত্তর ঢাকা এলাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ কোটি ৮৭ লাখ মানুষ যাতায়াত করেন। অন্যদিকে বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই হতাশাজনক। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৬ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম।
দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র রাজধানী। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়, ব্যাংক-বিমা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের করপোরেট অফিস এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রীভূত। ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কর্মসংস্থান ও উন্নত নাগরিক সুবিধার সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়েই মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে। এতে প্রতিদিন কর্মজীবী মানুষের চাপে অচল হয়ে পড়ছে সড়ক এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে যানজটে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা, ফুটপাত দখল, আবাসন সংকট এবং জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয় মিলিয়ে নগরবাসীর জীবনমান দিন দিন নিম্নমুখী হচ্ছে।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে হলে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। দেশের অধিকাংশ বড় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় ঢাকায়। সরকারি দপ্তর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বড় অংশ রাজধানীকেন্দ্রীভূত হওয়ায় চাকরি বা পেশাগত সুযোগের জন্য মানুষকে ঢাকায় আসতে হচ্ছে। ঢাকার বাইরে পর্যাপ্ত মানসম্মত চাকরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে এই নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতো।”
তিনি আরও যোগ করেন, “ঢাকার ফুটপাত-রাস্তায় হকারদের উপস্থিতি নিত্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকার বাইরে আয়ের সুযোগ না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে ফুটপাতে বসছে। এদের শুধু উচ্ছেদ না করে স্থায়ী পুনর্বাসনে জোর দিতে হবে, অন্যথায় সমস্যার সমাধান হবে না।”
আয়তনের তুলনায় মেগাসিটিতে জনসংখ্যার বিকট চাপ বিবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৫৯ লাখ ৭৯ হাজার ৫৩৭ এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৪২ লাখ ৯৯ হাজার ৩৪৫ জন মানুষের বসবাস। এই ঘনবসতির বিপরীতে পার্ক, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের ঘাটতি অত্যন্ত প্রকট। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) উদ্ধৃত করে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় প্রয়োজনীয় উন্মুক্ত স্থান রয়েছে মাত্র ০.৯ শতাংশ।
দৈনন্দিন যানজট ও বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে সৃষ্টি হওয়া যানজট নগরবাসীর জন্য চরম ভোগান্তি ডেকে এনেছে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র যানজটের কারণে ঢাকা শহরে বছরে প্রায় ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে এবং প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।
দখলকৃত ফুটপাত ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মতিঝিল, ফার্মগেট, নিউমার্কেট, মিরপুর ও মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও সড়কের অংশ হকারদের দখলে চলে যাওয়ায় পথচারীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়কে হাঁটতে হচ্ছে। সঠিক পুনর্বাসন নীতি না থাকায় বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েও ফুটপাত দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না।
এর পাশাপাশি বিশ্বমানের পরিবেশদূষণ নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত আইকিউএয়ারের ‘ওয়ার্ল্ড এয়ার কোয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, দূষিত বায়ুর বৈশ্বিক শীর্ষ রাজধানী শহরগুলোর তালিকায় ঢাকা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। একই সাথে সাশ্রয়ী আবাসনের অভাবে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ আয়ের সিংহভাগ বাসাভাড়ায় ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন এবং ঘিঞ্জি পরিবেশের বস্তি ও নিম্নমানের আবাসনে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন