ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
দীর্ঘদিন ধরে স্নায়ুর জটিল ব্যাধি মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের (এমএস) সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন মিসরের জনপ্রিয় শিশুশিল্পী থেকে তারকা অভিনেতা হয়ে ওঠা আমর মোহাম্মদ আলী। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সোমবার তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৫০ বছর।
ঘাতক এই ব্যাধিটি তার শরীরের স্বাভাবিক চলাচলের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অভিনয়জগৎ থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি পর্দার আড়ালে জীবনযাপন করতে বাধ্য হন তিনি।
মিসরীয় অ্যাক্টরস সিন্ডিকেটের সভাপতি আশরাফ জাকি এই অভিনেতার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস বা এমএস সংক্রান্ত জটিলতায় আমরের স্বাস্থ্য ও শারীরিক সক্ষমতার ব্যাপক অবনতি ঘটেছিল। মৃত্যুর আগের কয়েক দিন তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে।
মিসরীয় সংবাদপত্র ‘আল ওয়াতান’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মরহুমের ভাই আহমেদ জানান, মৃত্যুর ঠিক আগে তার ভাই সম্পূর্ণভাবে অন্যের সাহায্য ছাড়া দাঁড়ানো বা চলাফেরা করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় একপর্যায়ে খাবার ও পানীয় গ্রহণও পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে একজন শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়জীবন শুরু করেন আমর মোহাম্মদ আলী। ছোটবেলা থেকেই মিসরীয় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটকে সাবলীল অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের বিপুল ভালোবাসা ও পরিচিতি লাভ করেন তিনি।
তাকে মূলত ‘মিস্টার ক্যারাতে’, ‘রাইয়া অ্যান্ড সাকিনা’, ‘হাওয়া ওয়াল তুফফাহা’ এবং ‘হিকায়াত মাজনুনা’-র মতো একাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে দেখা গেছে। এ ছাড়া প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেতা নূর এল শেরিফের সঙ্গে ‘ইশ আইয়ামাক’ নাটকে এবং বিশেষ করে আরেক বিখ্যাত অভিনেতা সালাহ এল সাআদানির বিপরীতে ‘আরাবেস্ক’ ধারাবাহিক নাটকে ‘শাকশাক’ চরিত্রে তার অনবদ্য পারফরম্যান্স দর্শকদের হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
২০০৬ সালে প্রচারিত টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘হাদায়েক আল শয়তান’-এ তাকে সর্বশেষ অভিনয় করতে দেখা যায়। এর পরপরই শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে তিনি দীর্ঘকালের জন্য রুপালি পর্দা থেকে ছিটকে পড়েন।
দীর্ঘ ১৭ বছর অন্তরালে থাকার পর পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রকাশ্যে নিজের অসুস্থতা নিয়ে কথা বলেন। সেখানে তিনি জানান, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস কীভাবে তার সার্বিক দৈনন্দিন জীবন, শরীরের ভারসাম্য এবং দৃষ্টিশক্তিকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।
তবে শারীরিক পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি হলে তিনি আবারও অভিনয়ে ফেরার আকুল ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেছিলেন। পরবর্তীতে মিসরের অ্যাক্টরস সিন্ডিকেট তার এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ায় এবং তাকে সংগঠনের সদস্যপদ দেওয়ার পাশাপাশি একটি ব্যতিক্রমী বিশেষ ভাতা বা পেনশন মঞ্জুর করে।
উল্লেখ্য, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক রোগ, যা মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র, অর্থাৎ মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডকে সরাসরি আক্রমণ করে। এই রোগে আক্রান্ত হলে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুলবশত স্নায়ুতন্তুর প্রতিরক্ষামূলক স্তর বা মায়েলিনকে ধ্বংস করে ফেলে। এর ফলে মস্তিষ্ক থেকে শরীরের অন্যান্য অংশে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
এর লক্ষণ হিসেবে রোগীদের মধ্যে অবশভাব, মাংসপেশির দুর্বলতা, হাঁটাচলায় অসচ্ছলতা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, তীব্র ক্লান্তি এবং স্মরণশক্তি হ্রাস পাওয়ার মতো একাধিক উপসর্গ দেখা দেয়। বর্তমানে রোগটির নিরাময়ে কোনো স্থায়ী প্রতিষেধক বা চিকিৎসা আবিষ্কৃত না হলেও, সঠিক ফিজিওথেরাপি ও ওষুধের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রোগের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ ও জীবনযাত্রার মান কিছুটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়।
সূত্র: গালফ নিউজ










কমেন্ট করুন