Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি

কৃষিঋণ মওকুফে স্বস্তিতে ১৪ লাখ কৃষক, গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার

ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সারাদেশে ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল ঋণ ও জমে থাকা সম্পূর্ণ সুদ মওকুফ করেছে। এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকারের সর্বমোট ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। বছরের পর বছর ধরে বহন করা ঋণের বোঝা থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে প্রান্তিক কৃষক পরিবারগুলোর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
সরকারের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে ঋণখেলাপির দায়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত কৃষকদের নতুন করে ব্যাংকঋণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সাথে স্থানীয় মহাজনি ঋণ ও চড়া সুদের দাদন ব্যবসার ওপর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অতি-নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণগ্রহীতাদের আসলসহ সমুদয় সুদ ও বকেয়া মওকুফ করাকে অর্থনীতিবিদরা কৃষকদের জন্য একটি বড় আর্থিক আশীর্বাদ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে জানান, সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের এই সিদ্ধান্ত প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিশেষ উপহার স্বরূপ। এই পদক্ষেপ সমগ্র গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক গতির সঞ্চার করবে।
তিনি উল্লেখ করেন, কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা মজবুত হয়। সে লক্ষ্যে কৃষি উৎপাদন খরচ কমানো, মানসম্মত উপকরণের জোগান সুনিশ্চিত করা এবং সরাসরি ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার তালিকায় শীর্ষে রাখতে হবে।
অধ্যাপক আবু আহমেদ আরও বলেন, দেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিলে চড়া দামে বিদেশ থেকে খাদ্য সামগ্রী আমদানির বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। বিশ্ববাজারে সংকট তৈরি হলে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো উৎপাদক দেশগুলোও চড়া মূল্যে খাদ্য বিক্রি করে। সুতরাং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশীয় কৃষিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
তবে কেবল ঋণ মওকুফেই কৃষকের সব সংকট দূর হবে না স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বহু কৃষকের ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার, ৩০ হাজার কিংবা ৫০ হাজার টাকা বা তারও বেশি। তা সত্ত্বেও বর্তমান উদ্যোগ প্রান্তিক কৃষকদের সাময়িক বিপদ কাটাতে বড় ভূমিকা রাখবে।
যশোর সদর উপজেলার একাধিক কৃষকের বক্তব্যে ঋণ মওকুফের প্রত্যক্ষ সুফল ফুটে উঠেছে। তারা বাসসকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তায় দিন কাটানোর পর সরকারের এই ঘোষণায় তারা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন।
উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের নারাঙ্গলী গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেন ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি তালিকায় নাম লিখিয়েছিলেন। দেনা শোধ করতে না পেরে বসতবাড়ির গাছ কিংবা গোয়ালের একমাত্র গরু বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। তবে ঋণ মওকুফ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এই শেষ সম্বলগুলো তাকে খোয়াতে হয়নি।
ফারুক হোসেন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “যাদেরকে বন্ধু-বান্ধব ভাবছিলি এরাই আসল ম্যাঙ্গো মাদার কুইন সন।” তার কাঁধ থেকে বিরাট একটি মানসিক ও আর্থিক চাপ নেমে গেছে এবং বিপদের সংস্থান গোয়ালের গরু ও বাড়ির গাছ রক্ষা পেয়েছে।
অনুরূপভাবে চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ঝাউদিয়া গ্রামের কৃষক মো. মহিউদ্দিন জানান, ১০ হাজার টাকার বকেয়া ঋণ শোধ করতে না পেরে তিনি প্রচণ্ড পারিবারিক চাপে ছিলেন। নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি ঋণ মওকুফের যে অঙ্গীকার করেছিল, ক্ষমতায় এসে তা বাস্তবায়ন করায় তিনি আনন্দিত।
তিনি বলেন, তার নিজস্ব কোনো স্থাবর সম্পদ ছিল না যা বিক্রি করে ঋণ শোধ করা সম্ভব হতো। সরকারের এই পদক্ষেপ তাকে চরম বিপদ থেকে রক্ষা করেছে।
এছাড়া চাঁচড়া ইউনিয়নের রূপদিয়া গ্রামের কৃষক ইদ্রিস আলী এবং আরবপুর ইউনিয়নের মালঞ্চী গ্রামের কৃষক হায়দার আলীও সরকারের ঋণ মওকুফের এই সিদ্ধান্তে পূর্ণ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
দেশব্যাপী পরিচালিত এই ঋণ মওকুফ কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি সুফল পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের গ্রাহকরা। প্রতিষ্ঠানটির আওতায় ৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ জন কৃষকের মোট ৬০৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা ঋণ মওকুফ করা হয়েছে।
পাশাপাশি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বেসরকারি ব্যাংকসমূহের মাধ্যমে সুবিধা পেয়েছেন আরও ৭ লাখ ২৪ হাজার ৮০ ৩ জন কৃষক। তাঁদের অনুকূলে মওকুফকৃত অর্থের পরিমাণ ৭৪৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ব্যাংকগুলোর যৌথ সমন্বয়ে নির্ধারিত নীতিমালার আওতায় এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়। কৃষকদের যে কোনো ধরনের বাড়তি হয়রানি থেকে মুক্ত রাখতে ব্যাংকগুলো সরাসরি মাঠ পর্যায়ে এ কার্যক্রম পরিচালনা করে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের সামগ্রিক অবদান ছিল ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। তবে ব্যাংকগুলোর সর্বমোট ঋণ বিতরণের বিপরীতে কৃষি ও পল্লী খাতের অংশ ছিল মাত্র ২ দশমিক ২৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই নীতি কাঠামোর আলোকেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা ব্যাংকগুলোর নিট ঋণ ও অগ্রিমের ৪ শতাংশের সমতুল্য। বিগত অর্থবছরের তুলনায় নতুন নির্ধারিত এই লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লী খাতে মোট ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছিল, যা নির্ধারিত ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রাকে অতিক্রম করে।
তার আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী খাতে বিতরিত ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কৃষি ঋণ বিতরণ ৫ হাজার ৫০৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বা ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি হওয়ার কারণে এতদিন যেসব কৃষক ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন, এই মওকুফ কর্মসূচি তাঁদের সামনে পুনরায় ব্যাংকঋণ গ্রহণের নতুন দুয়ার উন্মোচন করবে। একই সঙ্গে সরকার ব্যাংকগুলোকে মওকুফকৃত অর্থ পরিশোধ করে দেওয়ায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে, যা গ্রামীণ পর্যায়ে নতুন ঋণের প্রবাহ বাড়িয়ে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে বহুগুণ গতিশীল করবে।
সূত্র: বাসস

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন