Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি

পদ্মা ও যমুনাকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক করিডরের বৃহৎ পরিকল্পনা

ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
পদ্মা ও যমুনা নদীকে কেন্দ্র করে দেশের উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে একটি আধুনিক অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনার মূল স্তম্ভ হিসেবে থাকছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু ও দ্বিতীয় যমুনা সেতু। প্রস্তাবিত ‘ওয়াই’ (Y) আকৃতির নকশায় নির্মিতব্য সেতু দুটি চালু হলে নদীর দুই প্রান্তে পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্প, পর্যটন, গুদাম এবং পরিবহন হাব গড়ে উঠবে। অর্থ বিভাগের সূত্রে এই রূপরেখার কথা জানা গেছে।
সংক্রান্ত সূত্র জানায়, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা, প্রাক্কলিত ব্যয় ও প্রযুক্তিগত দিক পর্যালোচনার জন্য চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দ্বিতীয় যমুনা সেতুর ফিজিবিলিটি স্টাডির বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার অংশ হিসেবে জাপান সরকার, জাইকা এবং চায়না হারবার কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ ও চিঠি চালাচালি অব্যাহত রয়েছে। সবকিছু অনুকূলে থাকলে চলতি বছরের শেষ ভাগেই সমীক্ষাকাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সেতুটির সম্ভাব্য রুট হিসেবে বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ এবং গাইবান্ধার বালাসী থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের প্রস্তাব ভাবনায় রাখা হলেও চূড়ান্ত নকশা নির্ভর করবে সমীক্ষার ফলাফলের ওপর।
উন্নয়ন প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর মন্তব্য করেন, পদ্মা ও যমুনা নদীকে ঘিরে তৈরি হতে যাওয়া এই যোগাযোগ অবকাঠামোকে শুধুই সাধারণ সেতু হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলোকে কৃষি, শিল্প, পণ্য পরিবহন এবং পর্যটন খাতের একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক করিডর হিসেবে সাজাতে হবে। সেতুর দুই পাড়ে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং রাজধানী ঢাকা নির্ভর উন্নয়নের মানসিক চাপ ও ভিড় অনেকটাই প্রশমিত হবে।
ওয়াই মডেলে বিস্তৃত হবে যোগাযোগ
ওয়াই মডেলের মৌলিক নীতি হলো একটি মূল পয়েন্ট থেকে একাধিক আঞ্চলিক সড়কের দিকে সংযোগ সম্প্রসারিত করা। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া করিডর দৃশ্যমান হলে ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনার বিকল্প যাতায়াত পথ তৈরি হবে। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মালামাল দ্রুত ঢাকায় আনার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলেও অনায়াসে পাঠানো সম্ভব হবে। অন্যদিকে, সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ করিডর নির্মিত হলে বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, রংপুর ও দিনাজপুরের সঙ্গে জামালপুর, ময়মনসিংহ ও শেরপুরের যাতায়াত বেশ সহজ হবে। এছাড়া বালাসী-দেওয়ানগঞ্জ করিডর বাস্তবায়িত হলে গাইবান্ধা ও রংপুরের সঙ্গে বৃহত্তর ময়মনসিংহ এবং পূর্বাঞ্চলের সংযোগ নতুন মাত্রা পাবে। এতে বগুড়া থেকে ঢাকার দূরত্ব যেমন কমবে, তেমনি জ্বালানি, সময় ও যাতায়াত খরচ সাশ্রয় হয়ে উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা যাবে।
কৃষি খাতে আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা
উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যাপক কৃষি উৎপাদনের বিপরীতে প্র প্রয়োজনীয় হিমাগার, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও পরিবহন কাঠামোর সংকট রয়েছে। সেতু দুটি বাস্তবায়িত হলে সংযোগ সড়ক সংলগ্ন এলাকায় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, হিমাগার, শস্য গুদাম, মোড়কীকরণ শিল্প ও লজিস্টিকস হাব গড়ে উঠবে। বগুড়া, নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া ও যশোরের উৎপাদিত ফসল স্থানীয়ভাবে প্রসেস করে দেশ-বিদেশে সরবরাহ করা সহজ হবে। আলু, দুধ, ফল ও মাছ থেকে নানা প্রক্রিয়াজাত ও হিমায়িত খাদ্য তৈরির সুযোগ উন্মুক্ত হবে, যা কৃষককে বাড়তি আর্থিক সুবিধা দেবে।
গড়ে উঠবে নতুন শিল্পাঞ্চল
উভয় সেতুর সংযোগস্থলে সুপরিকল্পিত কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকায় চাপ না বাড়িয়ে দেশের অন্যত্র উৎপাদন কেন্দ্র ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলে সময় ও পরিবহন ব্যয় কমে আসবে। একই সঙ্গে স্থানীয় যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
উন্মোচিত হবে পর্যটনের দুয়ার
পদ্মা ও যমুনার বিশাল চর, নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা ও সৌন্দর্যের ওপর ভিত্তি করে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। পাশাপাশি মহাস্থানগড় ও রাজবাড়ী-ফরিদপুরের ঐতিহ্যগত লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে যাতায়াত সহজ হলে রাজধানী থেকে আসা পর্যটকরা সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে এসব স্থান ভ্রমণ করতে পারবেন। এতে করে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন ব্যবসা সমৃদ্ধি পাবে।
পণ্য পরিবহনের বিকল্প করিডর
বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের পণ্য আনা-নেওয়া যমুনা সেতুর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কোনো কারণে এ রুটে জটলা তৈরি হলে পুরো সরবরাহ লাইনে সমস্যা দেখা দেয়। দ্বিতীয় যমুনা সেতু এই চাপ কমাবে। একইভাবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর কৃষিপণ্য সরাসরি রাজধানী ও উত্তরে পাঠাতে সাহায্য করবে। এসব সেতুতে ট্রেন লাইন যুক্ত হলে দেশের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা নতুন ধাপে উন্নীত হবে।
চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত সমীক্ষার পর
দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর ফিজিবিলিটি টেস্টের জন্য বরাদ্দ মিললেও প্রকল্পের মোট অর্থায়ন বা নকশা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। একইভাবে যমুনা সেতুর সম্ভাব্য রুট যাচাইয়ের কাজও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে ওয়াই মডেলকে আপাতত প্রস্তাবিত একটি ধারণা হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে। তবে কার্যকর পরিকল্পনার আওতায় এই দুই সেতু বাস্তবায়িত হলে দেশে সার্বিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যে নতুন বিপ্লব ঘটবে।

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন