Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি
ছবি : সংগৃহীত

বিতর্কিত পরিকল্পনা প্রত্যাহার, ক্ষমা চেয়ে ফিফা সভাপতির পদে বহাল ইনফান্তিনো

ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:

ফিফার বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কিত একটি সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। বিশ্বকাপসহ বড় টুর্নামেন্টের অংশীদারত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা বাতিল করে নিজের ‘ভুল’ স্বীকার করেছেন তিনি এবং ক্ষমাও চেয়েছেন। তবে মরক্কোয় অনুষ্ঠিত বৈঠকে ফিফার শীর্ষ নির্বাহীদের সমর্থন পাওয়ায় সংস্থাটির সভাপতি হিসেবেই বহাল থাকছেন ইনফান্তিনো।

পরিকল্পনাটি বাতিলের পরও সমালোচনার ঝড় থামেনি। এ পরিস্থিতিতে ফিফার পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের নিয়ে জরুরি সভা আহ্বান করেন ইনফান্তিনো। গতকাল মরক্কোর রাবাতে ফিফার আফ্রিকান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠক শেষে চার ঘণ্টা পর ইনফান্তিনোর প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

ফিফার মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম ও উপস্থিত পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা বিবৃতিতে বলেন, ‘ফিফার ২১১টি সদস্যদেশের ভোটে নির্বাচিত একমাত্র অফিসিয়াল হিসেবে সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ওপর পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হচ্ছে।’

বিতর্কিত প্রস্তাবটি যেভাবে উপস্থাপন ও পরিচালনা করা হয়েছিল, তা নিয়ে ফিফার ভেতর থেকেই ইনফান্তিনোর ওপর চাপ বাড়তে থাকে। গত শনিবার পরিকল্পনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহারের পর তার পদত্যাগের দাবিও জোরালো হয়ে ওঠে।

রাবাতের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ফিফার মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম। গত মঙ্গলবার কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো এক অভ্যন্তরীণ স্মারকে তিনি পুরো ঘটনাকে ‘একটি দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনাক্রম’ বলে উল্লেখ করেন। তবে বৈঠক শেষে প্রকাশিত বিবৃতিতে তিনি এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

বিবিসি জানিয়েছে, ইনফান্তিনো ও গ্রাফস্ট্রোম যৌথভাবে ফিফার সহসভাপতি, কাউন্সিল এবং ২১১টি সদস্যদেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কাছে একটি স্বাক্ষরিত চিঠি পাঠিয়েছেন। সেখানে নিজেদের ভুলের জন্য তারা ‘আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা’ করেন এবং ‘ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটার’ অঙ্গীকার জানান।

বৈঠক শেষে রাবাতে মেয়েদের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের একটি ম্যাচ একসঙ্গে উপভোগ করেন ইনফান্তিনো ও গ্রাফস্ট্রোম। তাদের সঙ্গে ছিলেন মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফৌজি লেকজা। শুরু থেকেই ইনফান্তিনোর সমর্থনে থাকা অল্প কয়েকজন কর্মকর্তার একজন লেকজা। তিনি পরিকল্পনাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে ‘বিজ্ঞোচিত’ বলে আখ্যা দেন এবং গত ১০ বছরে বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নে ইনফান্তিনোর অবদানের প্রতি সমর্থন জানান।

ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) নামে নতুন একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। এ পরিকল্পনায় সম্মত হলে প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনকে ৪ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাবও রাখা হয়েছিল। তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।

পর্তুগালের কিংবদন্তি ফুটবলার লুইস ফিগো বলেন, ‘ইনফান্তিনো যে পদটির মান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটিকেই তিনি অবনমিত করেছেন। তার সম্মান বাঁচানোর সময় পার হয়ে গেছে, তবে ফুটবলকে বাঁচানোর সময় এখনো আছে।’

মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা ও কনক্যাকাফ এ নিয়ে কড়া বিবৃতি দেয়। তাদের প্রতি সমর্থন জানায় এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। পাশাপাশি বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয় উয়েফার অধিভুক্ত ৫৫টি দেশ।

ফিফা জানিয়েছে, বুধবারের বৈঠকে এফএফই-সংক্রান্ত ‘ভুলত্রুটি স্বীকার’ করা হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য, ফিফা কাউন্সিল ও সদস্যদেশগুলোকে এই ‘প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা’ তাদের উদ্দেশ্য ছিল না এবং ‘বিষয়টি ভিন্নভাবে সামলানো উচিত ছিল।’

সংস্থাটি আরও জানায়, ‘সংবাদমাধ্যমে প্রস্তাবটি ফাঁস হওয়ার পর যে ভুলগুলো হয়েছিল, সেসব মেনে নেওয়া হয়েছে।’ গত ২৮ জুলাই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস প্রথম ইনফান্তিনোর এই গোপন পরিকল্পনার খবর প্রকাশ করে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘ভাবমূর্তি, সুশাসন ও নিয়মকানুন নিয়ে কোনো আক্রমণ আর বরদাশত করা হবে না এবং নিজেদের সুনাম রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এর আগে দ্য টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের বিষয়ে ফিফা দাবি করে, মরক্কোকে ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বলে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তা ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’। সংস্থাটি জানায়, স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত ওই বিশ্বকাপের ফাইনাল কোথায় হবে, সে সিদ্ধান্ত ‘যথাসময়ে’ নেওয়া হবে।

ক্ষমা চাইলেও কি থামবে বিতর্ক?

ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে ১০ বছরের দায়িত্বকালের সবচেয়ে বড় বিতর্কের ইতি টানতে চান ইনফান্তিনো। তবে ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সমর্থন পেলেও সমালোচনার মুখ থেকে তিনি এখনো বের হতে পারেননি।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, ইনফান্তিনোর ওপর তার কোনো আস্থা নেই। অন্যদিকে বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ ও পর্তুগালের সাবেক উইঙ্গার লুইস ফিগো আবারও তাকে অবিলম্বে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন।

ফিগো বলেন, ‘ইনফান্তিনো যে পদটির মান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটিকেই তিনি অবনমিত করেছেন। তাঁর সম্মান বাঁচানোর সময় পার হয়ে গেছে, তবে ফুটবলকে বাঁচানোর সময় এখনো আছে।’

সব বিতর্কের মধ্যেও ৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনো ফিফা সভাপতি হিসেবে চতুর্থ মেয়াদের জন্য পুনর্নির্বাচনে লড়বেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মরক্কোয় ২০২৭ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত হবে ফিফা কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন। আগ্রহী প্রার্থীরা আগামী ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত মনোনয়ন জমা দিতে পারবেন। নির্বাচনে জয়ের জন্য ২১১টি সদস্যদেশের মধ্যে অন্তত ১০৬টি ভোট প্রয়োজন হবে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার অবস্থান ভিন্ন। সংস্থাটি আগেই জানিয়েছে, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর তাদের আস্থা নেই এবং ফিফার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও দিয়েছে। ওয়েলসসহ একাধিক সদস্যদেশ তার পুনর্নির্বাচনের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছে।

ফিফার দাবি, ‘ভুলত্রুটি হলেও যা করা হয়েছে, তা ফিফার বিদ্যমান নিয়মনীতির আলোকেই করা হয়েছে।’ সংস্থাটির আশা, বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো ‘ফিফার সুশাসনকে শক্তিশালী করবে এবং সংস্থার প্রতি আবার আস্থা ফিরিয়ে আনবে।’

তবে এসব আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ও ক্ষমা প্রার্থনায় উয়েফার অসন্তোষ কতটা কমবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন