ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
ইরানের সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রণ রুখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্দার আড়ালে নজিরবিহীন মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তেহরানের এই রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে কোনো দেশ যোগ দিলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ফাটল ধরার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া বার্ষিক উন্নয়ন সহায়তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর হুমকি দেওয়া হয়েছে। ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম এক বিশেষ প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর এই দাবি করেছে।
একটি নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে গত শুক্রবার তাসনিম নিউজ জানায়, বিগত পাঁচ দিন ধরে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের কর্মকর্তারা তেহরানের এই স্মরণসভায় যেন কোনো রাষ্ট্র তাদের প্রতিনিধি দল না পাঠায়, সেই লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে একযোগে একটি সমন্বিত ও কঠোর কূটনৈতিক প্রচারণা চালিয়েছেন।
প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ জুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত আমেরিকার সবকটি দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলোতে একটি গোপন দিকনির্দেশনা সংবলিত বার্তা পাঠান। ওই বিশেষ বার্তায় নির্দেশ দেওয়া হয় যে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে যেন খুব স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করা হয় যে—ইরানি নেতার এই বিদায় অনুষ্ঠানে শামিল হওয়াকে ওয়াশিংটন একটি ‘অবন্ধুসুলভ পদক্ষেপ’ হিসেবে বিবেচনা করবে, যার সরাসরি ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে আমেরিকার সঙ্গে তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন আরব কূটনীতিকের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ব্যক্তিগতভাবে অন্তত পাঁচটি আরব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে এই সংবেদনশীল বিষয়ে সরাসরি কথা বলেন এবং তীব্র চাপ সৃষ্টি করেন। এর পাশাপাশি, আফ্রিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতরা নিজ নিজ দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়ে জানান, তারা যদি এই জানাজায় অংশ নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া বার্ষিক উন্নয়ন অনুদান ও আর্থিক সহায়তা বড় আকারে কাটছাঁট কিংবা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
আমেরিকার এমন প্রচ্ছন্ন ও কঠোর হুমকির মুখে পড়ে উত্তর আফ্রিকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ শেষ মুহূর্তে এসে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি এড়াতে তাদের প্রতিনিধি দলের স্তর (লেভেল অব রিপ্রেজেন্টেশন) উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মহলের গভীর মূল্যায়ন অনুসারে, হোয়াইট হাউজের এই তীব্র ও আগ্রাসী মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত অন্তত ১৩টি দেশ তেহরানের এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। পিছু হটে যাওয়া এই দেশগুলোর মধ্যে পূর্ব ইউরোপের তিনটি, আফ্রিকার পাঁচটি, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দুটি এবং পূর্ব এশিয়ার দুটি রাষ্ট্র রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বিস্তারিত উল্লেখ করা হয় যে, মার্কিন এই নজিরবিহীন চাপের কারণে যারা সশরীরে হাজির হতে পারেনি, এমন বেশ কয়েকটি দেশ জেনেভা ও নিউ ইয়র্কে অবস্থিত তাদের স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন অথবা কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ইরানের প্রশাসনের কাছে সবিশেষ দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং তাদের এই পরিস্থিতির নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করেছে। অন্য দিকে, কিছু রাষ্ট্র সরাসরি তেহরানে নিযুক্ত তাদের স্থানীয় কূটনীতিকদের এই অনুষ্ঠানে পাঠানোর জন্য বিকল্প প্রস্তাব দিলেও প্রটোকলজনিত জটিলতার কারণে ইরান কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
বিশ্বের অন্যতম এক প্রভাবশালী নেতার চিরবিদায়ের মুহূর্তে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন নজিরবিহীন ও আগ্রাসী কূটনৈতিক তৎপরতা এবং নিষেধাজ্ঞা-হুমকির বিষয়টি বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে এক বিশাল বিতর্ক ও কৌতূহলী আলোচনার জন্ম দিয়েছে।










কমেন্ট করুন