ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তিটিকে ‘হুকুমনামা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি মন্তব্য করেছেন, এই চুক্তিকে কোনোভাবেই প্রচলিত বাণিজ্যচুক্তি বলা চলে না। এটি মূলত মার্কিন প্রশাসনের একটি একতরফা নির্দেশিকা, যেখানে বাংলাদেশ কী কী করতে বাধ্য থাকবে, তা সম্পূর্ণ একপক্ষীয়ভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১০ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি: হুমকিতে দেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এই কথা বলেন। বাম ও প্রগতিশীল ১৩টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত ‘সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট’ এই বিশেষ বৈঠকের আয়োজন করে।
আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, এই বাণিজ্যচুক্তিতে ঘাটতি বাণিজ্যের খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে বাংলাদেশকে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে মার্কিন পণ্য ক্রয় করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক। চুক্তিটির ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে মনে হয়, এখানে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ প্রবাদের চেয়েও অনেক বেশি বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই চুক্তিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিবিধান কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বীকৃত কোনো নীতিমালার প্রতিফলন ঘটেনি।
চুক্তিটি সম্পাদনের সময়কাল নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের বিশেষ গরজ ও আগ্রহে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। অথচ দেশের স্বার্থে এই সংবেদনশীল বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করানো যেত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারতসহ বিশ্বের বেশিরভাগ রাষ্ট্র এই ধরনের চুক্তি এড়িয়ে গেছে অথবা এখনও আলোচনার স্তরেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। অনেক দেশ এই চুক্তি নিয়ে বিশদ ভাবছে, সময় নিচ্ছে কিংবা স্থগিত করেছে। অথচ বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এগিয়ে গিয়ে ও নিজ দায়িত্বে এই চুক্তি সম্পন্ন করেছে। যারা এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, তারা মূলত মার্কিন পক্ষেরই লোক।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেও এই চুক্তিটি বলবৎ রেখেছে উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অতিরিক্ত মূল্যে গম, তুলা, মাছ কিংবা মাংস আমদানি করতে হলে একদিকে দেশের রাজস্ব আয় হ্রাস পাবে, অন্যদিকে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াতে হবে। আর সেই আর্থিক বোঝা শেষপর্যন্ত দেশের সাধারণ জনগণের ঘাড়েই চেপে বসবে। আমাদের ওষুধ ও ডেইরিশিল্প, আইটি ও ই-কমার্স খাত এবং দেশীয় গ্যাস সম্পদ—সবকিছুই এই চুক্তির ফলে চরম ঝুঁকিতে পড়বে। কেননা বেশি দামে পণ্য আমদানি করলে তা দেশীয় বাজারে স্বাভাবিক দামে বিক্রি হবে না। ফলে সরকারকে সেখানে বিপুল ভর্তুকি দিতে হবে এবং রাষ্ট্র রাজস্ব হারাবে, যার চূড়ান্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ জনগণের ওপর।
উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান এই চুক্তিটিকে ‘একপক্ষীয় এবং অসম’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে বাতিলের জোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, চুক্তির মূল ভিত্তিটিই এখন বড় ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ। যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে বাংলাদেশ এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছিল, তা পরবর্তী সময়ে মার্কিন আদালতই বাতিল করে দেয়। নির্বাচনের ঠিক তিনদিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়, আর ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন আদালত সেই অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে অল্প কয়েকটা দিন অপেক্ষা করলেই এই অসম চুক্তির কোনো প্রয়োজনই পড়ত না।
চুক্তির শর্তের অসামঞ্জস্যতা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, এই চুক্তির বেড়াজালে জড়িয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির স্বাধীনতা চরমভাবে সংকুচিত হবে। চীনসহ বিশ্বের যেকোনো দেশের সাথে নতুন কোনো বাণিজ্যচুক্তি করতে হলে এখন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করার এক অদ্ভুত বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন পণ্যে শূন্য শুল্কের এই বিশেষ সুবিধা দেখে অন্যান্য মিত্র দেশগুলোও যদি একই দাবি তোলে, তবে বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপাকে পড়তে পারে।
অনুষ্ঠানে ‘চর্চা’র সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, এই অসম বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একতরফা সুবিধা ও নিজেদের কর্তৃত্ব সুনিশ্চিত করেছে। তারা বাংলাদেশের ওপর শুল্ক ও শুল্ক-বহির্ভূত নানা অসম শর্ত জোরপূর্বক চাপিয়ে দিয়েছে। এই সার্বিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে অবিলম্বে এই চুক্তি বাতিলের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা এই বিষয়ে বলেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রয়োজনীয়তার কোনো বিষয়কেই প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। সার্বিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, দেশ যেন সম্পূর্ণ মার্কিন নিয়ন্ত্রিত একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এখন এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, তাদের এই আগ্রাসন রুখতে হলে বিশ্বের বাকি সব দেশকে একত্রিত হতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের সমন্বয়ক এবং বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট বা কঠোর গোপনীয়তার নীতি মেনে সম্পাদিত হওয়া এই চুক্তিটি পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বর্তমান নির্বাচিত সরকার—কেউই জনগণের সামনে প্রকাশ করেনি। তবে মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের নিজস্ব ওয়েবসাইটে এই চুক্তির ২৮ পৃষ্ঠার একটি গোপন নথি প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই এই অসম বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করতে হবে।
এই গোলটেবিল বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন বিসিকের প্রাক্তন পরিচালক আবু তাহের খান এবং বিজিএমইএ’র সহসভাপতি ইনামুল হক খান প্রমুখ।










কমেন্ট করুন