Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি

হাতের জমানো অর্থ পুনরায় ফিরতে শুরু করেছে ব্যাংকে

ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
মানুষের হাতে জমা থাকা নগদ টাকা আবারও ব্যাংকিং খাতে প্রত্যাবর্তন করছে। কোরবানি ঈদের আমেজ শেষে জুন মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের একটি বড় অংশ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পুনঃপ্রবেশ করেছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকে ফিরে এসেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে জুন মাস শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের মোট স্থিতি কমে তিন লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকায় উপনীত হয়েছে। তবে গত এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের বাইরের নগদ অর্থ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বা সাড় ১৩ শতাংশ। মূলত জোড়া ঈদ উপলক্ষ্যে মার্চ ও মে মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ প্রবাহের এক বড় উর্ধগতি তৈরি হয়েছিল।
অপরদিকে গত জুনে ব্যাংকগুলোতে আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা একক মাসের হিসেবে নজিরবিহীন রেকর্ড। তবে এরপরও জুনে বার্ষিক আমানতের প্রবৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ১০.৭৪ শতাংশে, যা তার পূর্ববর্তী মাসে ছিল ১১.৪১ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ বিবরণীতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, ব্যাংকিং খাত কেন্দ্রিক অনিশ্চয়তা ও আস্থার ঘাটতি সাধারণ মানুষের কাছে অর্থ সংরক্ষণের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে। এখনও ব্যাংকে টাকা রাখার চাইতে নিজের হাতে নগদ জমা রাখাকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করছেন অনেকে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা পুনরুদ্ধার, দুর্বল ব্যাংকগুলোর দশা দ্রুত স্বাভাবিকীকরণ এবং আমানতকারীদের শঙ্কা দূর করা বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশ করা তথ্যে দেখা যায়, মে মাসের শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা মানুষের নগদ অর্থের স্থিতি ছিল তিন লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৩৬ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে মানুষের হাতে জমা থাকা টাকা কমেছে ১২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা।
কোরবানির ঈদ উদযাপনের পর ব্যাংকের বাইরে অবস্থান করা নগদ টাকার একটি অংশ ব্যাংকে প্রত্যাবর্তনের সময়টিতে এই পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। ঠিক একই সময়ে ব্যাংক খাতের মোট আমানতেও বড় ধরণের উল্লম্ফন পরিলক্ষিত হয়েছে। মে মাস শেষে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ছিল ২০ লাখ ৪১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা। জুনের সমাপ্তিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৭৯ হাজার ২৯৬ কোটি টাকায়। হিসাব অনুযায়ী এক মাসে আমানত বেড়েছে ৩৮ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা বা ১.৮৭ শতাংশ।
উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দুটি ঈদকে উপলক্ষ করে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের যাতায়াতে বড় ধরণের তারতম্য দেখা গেছে। রোজার ঈদের মাস মার্চে ব্যাংকের বাইরে মানুষের নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছিল ১৬ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। উৎসব শেষে এপ্রিল মাসে সেই অর্থের একাংশ আবার ব্যাংকিং কাঠামোয় ফিরে আসে। যার ফলে ওই মাসে ব্যাংকের বাইরে অবস্থানরত নগদ অর্থ কমে যায় তিন হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। তবে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মে মাসে উল্টো চিত্র ধরা দেয়। ওই মাসে ব্যাংকের বাইরে মানুষের কাছে থাকা নগদ টাকা বাড়ে ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। পরবর্তীতে জুনে ঈদের শেষে সেই প্রবণতার ঠিক বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হয়। মে মাসে ব্যাংকের বাইরে চলে যাওয়া বিপুল নগদ অর্থের একটি ভাগ পুনরায় ব্যাংকে আসায় মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা কমেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।
মাসিক পর্যালোচনায় জুনে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ হ্রাস পেলেও বার্ষিক হিসেবে তা এখনো ঊর্ধ্বমুখী। গত বছরের জুনে ব্যাংকের বাইরে অবস্থান করা মানুষের নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুনে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে তিন লাখ ৩৬ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মানুষের হাতে জমা থাকা নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বা ১৩.৪৭ শতাংশ। এর মাধ্যমে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, জুনে ঈদপরবর্তী সময়ে নগদ অর্থের একটি ভাগ ব্যাংকে ফেরত আসলেও ব্যাংকের বাইরে জমা থাকা মোট টাকা এখনো আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। সুতরাং কেবল ঈদ কেন্দ্রিক মৌসুমি চাহিদাই নয়, মানুষের কাছে অর্থ সঞ্চয়ের ধারার মধ্যেও কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না তা খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে।
নগদ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফেরার পাশাপাশি জুনে ব্যাংক খাতের আমানতেও বিশাল প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এক মাসে ৩৮ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা আমানত যোগ হওয়া সাম্প্রতিক সময়ের মাসগুলোর মধ্যে বেশ দৃষ্টিনন্দন। এর আগে মে মাসে তফসিলি ব্যাংকগুলোর আমানত বাড়ে কেবল দুই হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। আর রোজার ঈদের মাস মার্চে আমানত জমা পড়েছিল ৩৭ হাজার ১২২৩ কোটি টাকা। পাওয়া তথ্য বলছে, গত বছরের জুনের শেষে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট সঞ্চিত আমানত ছিল ১৮ লাখ ৭৭ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২০ লাখ ৭৯ হাজার ২৯৬ কোটি টাকায়। ফলশ্রুতিতে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি নথিভুক্ত হয়েছে ১০.৭৪ শতাংশ।

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন