ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
২০২৬ সাল ঘিরে বুলগেরিয়ার বিখ্যাত অন্ধ ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বাবা ভাঙ্গার নামে ছড়ানো একাধিক ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী নতুন করে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং সোনার বাজারে নজিরবিহীন অগ্নিমূল্যের আশঙ্কাসংবলিত এসব ভাইরাল বার্তার বাস্তব ভিত্তি ঠিক কতটুকু, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র কৌতুহল।
যুক্তরাষ্ট্রের ৯/১১ টুইন টাওয়ার হামলা, চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনা, প্রিন্সেস ডায়ানার অকস্মাৎ প্রয়াণ এবং ভারত মহাসাগরে ধেয়ে আসা ভয়াবহ সুনামির মতো ইতিহাসের একাধিক বড় ঘটনার সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত আগেভাগেই বাবা ভাঙ্গা দিয়ে গিয়েছিলেন বলে ব্যাপক জনশ্রুতি রয়েছে। এমনকি ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন ও সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের আত্মপ্রকাশ সংক্রান্ত পূর্বাভাস দেওয়ার কৃতিত্বও দেওয়া হয় তাকে। এবার ২০২৭ সাল কেন্দ্র করে তার নামে ছড়ানো একটি কথিত পূর্বাভাস নিয়ে শোরগোল পড়ে গেছে। নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়া দাবি অনুযায়ী, ২০২৭ সালে এক বৈশ্বিক মন্দা দেখা দেবে, যার ধাক্কায় সোনার মূল্য প্রায় ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লাফিয়ে বাড়তে পারে।
তবে এই আলোড়ন সৃষ্টিকারী দাবির সত্যতা নিয়ে মারাত্মক সংশয় রয়েছে। বাবা ভাঙ্গা প্রকৃতপক্ষে ২০২৭ সালে স্বর্ণের দরবৃদ্ধির বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করে গিয়েছিলেন কি না, তার স্বপক্ষে প্রামাণ্য বা বিশ্বাসযোগ্য কোনো নথিপত্র পাওয়া যায়নি। তার নামে কথিত অধিকাংশ ভাববাণীরই কোনো লিখিত ভিত্তি নেই। ফলে বাজারে গুঞ্জন ছড়ানো এই অতিরিক্ত দরবৃদ্ধির বিষয়টি নিতান্তই একটি অনলাইনভিত্তিক ভাইরাল গুজব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাস্তবতায় ২০২৭ সালে স্বর্ণের দাম কি সত্যিই ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২০২৭ সালে বিশ্বমন্দায় স্বর্ণের মূল্য ৪০ শতাংশ বাড়ার তথ্য ঘুরে বেড়ালেও অর্থনীতিতে এই ধাতুর দর উঠানামা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বৈশ্বিক গণিতের ওপর নির্ভর করে।
আন্তর্জাতিক বাজারে আকরিক ও অলংকার হিসেবে সোনার সার্বিক চাহিদা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার পরিবর্তন, মার্কিন ডলারের শক্তিমত্তা, বিভিন্ন রাষ্ট্রের ব্যাঙ্কিং রিজার্ভে সোনা জমানোর হার, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সার্বিক শেয়ার বিনিয়োগকারীদের মানসিকতা—এসব চলকের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় নির্ধারিত হয় দর। সুতরাং কোনো রূপকথা বা ভাইরাল বাণীর ওপর ভরসা করে ২০২৭ সালের বাজারের আগাম চিত্র নিশ্চিত করা অসম্ভব।
কে ছিলেন এই আলোচিত বাবা ভাঙ্গা? ১৯১১ সালে তৎকালীন বুলগেরিয়ায় জন্ম নেন বাবা ভাঙ্গা, যার পারিবারিক নাম ছিল ভ্যাঙ্গেলিয়া পান্দেভা দিমিত্রোভা। শৈশবেই তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হন। প্রচলিত রূপকথা অনুযায়ী, মাত্র ১২ বছর বয়সে এক প্রলয়ংকরী টর্নেডোর কবলে পড়ে দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারান তিনি। পরবর্তীকালে তিনি এক অলৌকিক ভবিষ্যৎদ্রষ্টা এবং ওষধি চিকিৎসক হিসেবে জনমানসে পরিচিতি লাভ করেন।
তার ভক্তদের একাংশের দৃঢ় বিশ্বাস, আমেরিকার ১১ সেপ্টেম্বরের জঙ্গি হামলা, চেরনোবিলের ট্র্যাজেডি, লেডি ডায়ানার পথ দুর্ঘটনা, ২০০৪ সালের সুনামি ও ব্রেক্সিট ট্র্যাজেডির ইঙ্গিত তিনি বহুকাল আগেই স্পষ্ট করেছিলেন। এমনকি অনুসারিদের দাবি, তার করা সমস্ত ভবিষ্যদ্বাণীর প্রায় ৮৫ শতাংশই বাস্তবে মিলে গেছে।
কোথায় লুকিয়ে রয়েছে বাবা ভাঙ্গার বাণীর আসল বিতর্ক? বাবা ভাঙ্গার বাণীর সত্যতা ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে বিতর্ক বহু পুরনো। এই ধোঁয়াশার প্রধান কারণ হলো তার মুখনিঃসৃত বাণীর সংকলিত কোনো প্রমাণ্য ও সুসংবদ্ধ বই বা রেকর্ড সংরক্ষিত নেই। ফলে আন্তর্জাতিক কোনো ঘটনা ঘটার আগে তিনি আদতে কী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তা নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ নেই।
বিভিন্ন সময়ে সময়সুযোগ বুঝে তার নামে আজব সব বার্তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০২৭ সালে সোনার দর ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার বার্তাটিও তেমনই এক মনগড়া পোস্ট। কাজেই একে বাস্তব সত্য মানার আগে উৎস ও তথ্য যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
সর্বোপরি, ২০২৭ সালে সোনার বাজারে চড়া ভাব আসবে কি আসবে না, তা পুরোপুরি নির্ভর করবে আগামী দিনের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য নীতির ওপর। বাবা ভাঙ্গার নামে ছড়ানো গুজবকে বাজার বিশ্লেষণের সংগে গুলিয়ে ফেলা সমীচীন হবে না।









কমেন্ট করুন