Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি
ছবি : সংগৃহীত

ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোন ‘রিভার্সনার’ বা উত্তরাধিকারী নন, গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হাইকোর্টের

ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:

হিন্দু দায়ভাগা আইনানুযায়ী স্বামীর প্রয়াণের পর প্রাপ্ত সম্পত্তিতে কেবল তার বিধবা স্ত্রীর জীবদ্দশাতেই পূর্ণ স্বত্ব ও অগ্রাধিকার বহাল থাকে; সুতরাং উক্ত সম্পত্তিতে কোনো বোন ‘রিভার্সনার’ বা পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজের অধিকার বা স্বত্ব দাবি করতে পারবেন না—এমনই তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট।

ভাইয়ের অর্জিত বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে বোন নিজেকে রিভার্সনার দাবি করে ইতিপূর্বে দায়ের করা এক দেওয়ানি রিভিশনের বিপরীতে জারি করা রুল সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। এর মাধ্যমে নিম্ন বিচারিক আদালতের পূর্ববর্তী দেওয়া রায় ও ডিক্রিকে বহাল রাখা হয়েছে।

‘অমর কুমার দাসের উত্তরাধিকারী লিলি রানী দাস এবং অন্যান্য বনাম ড. মনোরঞ্জন মহুরী এবং অন্যান্য’ শীর্ষক দেওয়ানি মামলার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনায় হাইকোর্ট উক্ত সিদ্ধান্ত ও পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন।

গত ৯ জুলাই বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল এবং বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের প্রদান করা এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ বিবরণী বুধবার (১২ আগস্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়। উক্ত মূল মামলার বিচারিক রায়ের অনুলিপি প্রস্তুত করেছেন বেঞ্চের জুনিয়র বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলাম।

আদালতে সংশ্লিষ্ট রিভিশন আবেদনের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমীরণ দাস গুপ্ত। অন্যদিকে বিবাদী বা প্রতিপক্ষের পক্ষে আইনি লড়াই চালান আইনজীবী তৌফিক আনোয়ার চৌধুরী।

চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার একটি বিতর্কিত জমি ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্রিক দেওয়ানি রিভিশন আবেদনের বিস্তারিত শুনানি সম্পন্ন করে হাইকোর্টের বিচারকদ্বয় এই আদেশ ব্যক্ত করেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর ২০০৮ সালে জারিকৃত রুলটি খারিজ হয়ে নিম্ন আদালতের রায়ই চূড়ান্ত আইনি মর্যাদা পেল।

মামলার প্রেক্ষাপট ও অধস্তন আদালতের রায়: নথি সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা রামকান্ত বিশ্বাসের পরিবারে এক পুত্র ও তিন কন্যা সন্তান ছিল। তিনি বিগত ১৯২০ সালে নিজস্ব অর্থায়নে ছেলে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের নামে পটিয়া উপজেলার অন্তর্ভুক্ত ১ দশমিক ৩৫ একর পরিমাণের নালিশি জমিটি রেজিস্ট্রি করেন। তবে পিতাজীবিত থাকা অবস্থাতেই সতীশ চন্দ্র বিশ্বাস মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৩৩ সালে পিতা রামকান্ত বিশ্বাসও পরলোক গমন করেন।

পরবর্তী সময়ে রামকান্ত বিশ্বাসের কন্যা শৌল বালা দাস উক্ত ক্রায়কৃত জমির ওপর নিজের পূর্ণ উত্তরাধিকার স্বত্ব দাবি করেন। অন্য কোণে, সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের বিধবা স্ত্রী সাবিত্রী বালা দাস তার জীবদ্দশায় ১৯৯৬ সালে উক্ত সম্পত্তিটি ড. মনোরঞ্জন মহুরীর নিকট আইনগতভাবে বিক্রি করে দেন।

উক্ত বিক্রয় চুক্তির পর ১৯৯৮ সালে পটিয়ার নিম্ন আদালতে (চৌকি আদালত) জমির মালিকানা দাবি তুলে দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন শৌল বালা দাস। মামলার আরজিতে বাদী অভিযোগ আনেন, দলিলের হস্তান্তর ছিল সম্পূর্ণ জাল, প্রতারণাপূর্ণ এবং আইনি বাধ্যবাধকতাবিহীন।

পটিয়ার তৎকালীন সাব-অর্ডিনেট জজ আদালত যাবতীয় সাক্ষ্য ও নথি পর্যালোচনা করে ২০০০ সালের ২২ জুন বাদী শৌল বালার দাবি খারিজ করে রায় প্রদান করেন।

বিচারিক আদালতের প্রদেয় আদেশে সংক্ষুব্ধ হয়ে বাদীপক্ষ চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতে আপিল আবেদন করে। পরবর্তীতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে চট্টগ্রামের ১ম অতিরিক্ত জেলা জজ ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আপিলটি পুনরায় খারিজ ঘোষণা করেন।

নিম্ন আদালতের পর পর দুটি রায় ও ডিক্রিতে সংক্ষুব্ধ হয়ে বাদীপক্ষ দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারা মোতাবেক ২০০৮ সালে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়ে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করে। আবেদনের প্রেক্ষিতে ওই বছরই হাইকোর্ট রুল জারি করেন।

দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০০৮ সালের সেই রুলটিকে গত ৯ জুলাই চূড়ান্তভাবে খারিজ করে হাইকোর্ট অধস্তন আদালতের সিদ্ধান্তকেই বহাল রাখলেন।

হাইকোর্ট বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ: দায়ভাগা হিন্দু আইন বিশ্লেষণ করে রায়ে বলা হয়, মৃত ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী বেঁচে থাকা অবস্থায় তার সম্পত্তিতে বোনের কোনো প্রকার উত্তরাধিকার বা ‘রিভার্সনার’ দাবি করার আইনগত অধিকার থাকে না।

উচ্চ আদালত হিন্দু দায়ভাগা রীতির অধীনে বিধবার সম্পত্তিতে অধিকার ও তার আইনি অবস্থান পরিষ্কার করে উল্লেখ করেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী নিজস্ব জীবদ্দশায় উক্ত সম্পত্তিতে পূর্ণ স্বত্ব ভোগ করেন। তবে সম্পত্তিটি অন্য কারো কাছে বিক্রি বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে তার একচ্ছত্র অধিকার কিছুটা সীমিত থাকে।

যদি কোনো বিধবা তার প্রাপ্ত সম্পত্তি হস্তান্তর করেন, তবে সেই হস্তান্তরকে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানানোর একচ্ছত্র সুযোগ সকলের থাকে না। হস্তান্তরের বৈধতা নিয়ে কেবল তিনিই প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবেন, যিনি বিধবার প্রয়াণের পর ওই সম্পত্তির প্রকৃত পরবর্তী উত্তরসূরি অর্থাৎ ‘রিভার্সনার’ হওয়ার যোগ্য।

যে ব্যক্তির উক্ত সম্পত্তিতে বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে আইনসম্মত কোনো উত্তরাধিকার বা কায়েমী স্বার্থ নেই, তিনি কোনোভাবেই বিধবার সম্পত্তি হস্তান্তরকে বেআইনি দাবি করে দেওয়ানি আদালতে মামলা ঠুকতে পারেন না।

প্রয়োজনের খাতিরে হস্তান্তরটি ‘আইনগত প্রয়োজনে’ করা হয়নি—শুধুমাত্র এই দোহাই দিয়ে সম্পত্তিতে অধিকারহীন কোনো ব্যক্তি স্বপ্রণোদিত হয়ে আদালতের কাছে হস্তান্তরের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন না বলে আদেশে স্পষ্ট করা হয়।

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন