Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি
ছবি : সংগৃহীত

প্রদর্শনীতে নিজেদের বিতর্কিত ইতিহাস আড়াল করল জামায়াত, ক্ষোভ ও সমালোচনা

ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:

১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক ইতিবৃত্ত তুলে ধরে আয়োজিত ফটো প্রদর্শনীতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত ভূমিকাকে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাজধানী ঢাকার মিন্টো রোডস্থ বিরোধীদলীয় নেতা তথা জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত ‘জুলাই এখনও শেষ হয় নাই’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে দলটির নেতিবাচক ভূমিকা হাওয়া করে দেওয়া হয়েছে।

চার দিনব্যাপী চলমান এই প্রদর্শনীটির অন্তিম দিবসে গতকাল আগত পরিদর্শকদের ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। প্রদর্শনীটিতে মহাদেশের দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, একনায়কতান্ত্রিক শাসন, সামরিক স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতন এবং সর্বশেষে জুলাই অভ্যুত্থানের শতাধিক আলোকচিত্র টাঙানো হলেও উধাও করে দেওয়া হয়েছে একাত্তরে জামায়াত নেতাদের পাকিস্তানঘেঁষা প্রশ্নবিদ্ধ সব ভূমিকার দৃশ্যচিত্র। যদিও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নির্বিচার গণহত্যা ও নির্যাতনের করুণ চিত্রাবলি ফ্রেমবন্দি করে আনা হয়েছিল। একইসঙ্গে সেই সময়ের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিবিধ বৈঠকের ছবির পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যুক্ত ছিল।

শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের বক্তব্য থেকে সূচনা করে বিজয় অর্জনের শুভক্ষণ পর্যন্ত একাধিক চিত্রপটে ইতিহাস স্থান পেলেও পুরোপুরি অনু অনুপস্থিত রাখা হয়েছে তৎকালীন দলীয় জামায়াতের ভূমিকা। এর পাশাপাশি স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এমনকি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অন্যতম কান্ডারি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকালকেও রাখা হয়নি উক্ত ফ্রেমে। আলোকচিত্রের মারফতে জামায়াতের এই ধরনের ভূমিকাকে সরাসরি ‘ইতিহাস বিকৃতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন দেশের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের মতো মহাসংগ্রামের দিনে জামায়াতের বিতর্কিত অবস্থান ঢাকতেই ৯ মাসের যুদ্ধ ইতিহাস থেকে তারা নিজেদের এভাবে মুছে ফেলার পথ বেছে নিয়েছে।

গতকাল সরেজমিনে আলোকচিত্র প্রদর্শনীস্থলে গিয়ে বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ে। মিরপুর এলাকা থেকে আসা ফয়েজ নামের এক দর্শনার্থী মন্তব্য করেন, ‘যদি জামায়াত ইতিহাস বিকৃত করে তাহলে তাদেরও ইতিহাস থেকে ফেলে দেবে এ দেশের সচেতন জনসাধারণ।’ অন্যদিকে স্বামীর হাত ধরে আসা গৃহিণী মুসফিকা তাসনীম নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘আলোকচিত্রে কেন এসব ইতিহাস নেই তা জামায়াত ভালো বলতে পারবে। এতে আমরা হতাশ হয়েছি। আবার একটু খুশি হয়েছি যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানকে সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।’

তিনি আরও সংযোজন করেন, ‘আমরা এত দিন শুনেছি জামায়াত শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগবিরোধী। অবশ্য ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে দলটি এসব বাদ দেয়নি।’ তবে সামগ্রিক বিবেচনায় এটিকে একটি অসম্পূর্ণ ইতিহাস বলে অভিহিত করেন মুসফিকা।

মুক্তিযুদ্ধের বর্ণাঢ্য ইতিহাস থেকে জামায়াতের ইতিহাস মুছে ফেলার মূল কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানান, ‘একটি প্রদর্শনীতে সবকিছু তুলে ধরা যায় না। এতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জুলাই আন্দোলনকে। তাই ইতিহাসের অনেক কিছু আসেনি। কেবল যেসব বিষয় প্রাসঙ্গিক সেগুলো এসেছে।’

ঐতিহাসিক এই আয়োজনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত আমাদের গুলি করেছে। তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এ দেশটাকে তারা চায়নি। যুদ্ধে আমাদের মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে, পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছে।’

একাত্তরে পরাজিত শক্তি হিসেবে অভিহিত করে জামায়াতের ইতিহাস টেনে তিনি আরও বলেন, ‘দলটি বারবার রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছে কিন্তু তাদের চরিত্র পাল্টায়নি। তারা সাপের মতো এবং মুনাফেক। ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে। আওয়ামী লীগ করেছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। মূলত আওয়ামী লীগ ও জামায়াত মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। জামায়াতের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

বিষয়টির তাত্পর্য ব্যাখ্যা করে বিশিষ্ট মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও বিশ্লেষক মফিদুল হক জানান, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে গণহত্যা হয়েছিল, সেটা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ। এটা বাদ দিয়ে কেউ ইতিহাসের বয়ান দিতে পারে না। আর এটা বলতে গেলে জামায়াতকে নিশ্চয় তাদের অবস্থানটা সুস্পষ্ট করতে হবে। এভাবে জামায়াত যদি মূল জায়গাতেই বিকৃত বয়ান হাজির করতে চায়, তাহলে তাদের পুরো রাজনৈতিক ইতিহাসে নিশ্চয় সেটার প্রতিফলন থাকবে।’

অতীতের গণহত্যার ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে তিনি আরও যুক্ত করেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় যে গণগত্যা হয়েছে তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায়। আমরা তো সেটাকে কোনোভাবেই ভুলে যেতে পারি না। কোনো রাজনৈতিক দল যদি সেটা মুছে ফেলার বা বিকৃত করার চেষ্টা চালায়, তাহলে আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না।’

ঘটনাস্থলে ঘুরে দেখা যায়, প্রদর্শিত ইতিহাসের ক্যানভাসটি আরম্ভ করা হয়েছে ‘আজাদী : অতঃপর স্বপ্নভঙ্গ’ শীর্ষক শিরোনামে। সূচনাতেই ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের রূপরেখা নিয়ে অনুষ্ঠিত পাঁচটি রাজনৈতিক বৈঠকের ছবি সাঁটানো হয়। অতঃপর শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মরণীয় মুহূর্ত। ৭ মার্চের ভাষণের চিত্রসহ ১২টি আলোকচিত্র ছিল মুক্তিযুদ্ধ পর্বে। পরবর্তী অংশে শেখ মুজিবুর রহমানের আমলকে ‘একনায়কতন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে বেশ কিছু ছবি প্রকাশ করা হয়।

ইতিহাসের পরবর্তী ধাপে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলকে ‘সামরিক স্বৈরশাসক’ রূপে চিত্রায়িত করা হয়েছে। এরপরের ১৮টি ফ্রেমজুড়ে ঠাঁই পেয়েছে শেখ হাসিনার শাসনকাল, যেখানে শিরোনাম করা হয় ‘ফ্যাসিবাদ’। সর্বশেষ আলোচ্ছটায় স্থান পেয়েছে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান।

জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রদত্ত সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বিবরণীতে ১৯৪৭ সাল প্রসঙ্গে লেখা হয়, ‘স্বাধীনতা এলো, রাষ্ট্র বদলাল না। জুলুমবাজ আইয়ুব ও ইয়াহিয়া খানের উত্থান হলো।’

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তারা উপস্থাপন করে, ‘দেশ স্বাধীন হলো, রাষ্ট্র বদলাল না। একনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থান হলো।’ অন্যদিকে ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন নিয়ে বলা হয়, ‘একনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের পতন হলো, রাষ্ট্র বদলাল না।’ পরবর্তীতে ১৯৯০ এর গণআন্দোলন প্রসঙ্গে উল্লেখ ছিল, ‘গণ অভ্যুত্থানে একনায়ক এরশাদের পতন হলো, রাষ্ট্র বদলাল না।’ এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসা নিয়ে তারা লেখে, ‘নতুন সরকার এলো, রাষ্ট্র বদলাল না। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার উত্থান হলো।’ অবশেষে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান বিষয়ে মন্তব্য করা হয়, ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থান হলো। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন হলো। আবার ফ্যাসিবাদ?’

সবশেষে আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে ‘আমাদেরকে পারতেই হবে, জুলাই এখনও শেষ হয় নাই’ শীর্ষক মূল লিফলেটে জামায়াত দাবি করে, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত একটি অসমাপ্ত বিপ্লবের ইতিহাস। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে প্রতিটি সংগ্রাম একেকটি নতুন স্বপ্নের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রকাঠামো ও সংবিধানের মৌলিক সংস্কার না হওয়ায় বারবার ফিরে এসেছে ফ্যাসিবাদ ও একদলীয় কর্তৃত্ববাদ। ২০২৪-এর জুলাই গণ অভ্যুত্থান সেই চক্র ভাঙার মোক্ষম সুযোগ।’ পরিশেষে প্রশ্ন রেখে প্রদর্শনীর সমাপ্তি টানা হয়, ‘আমরা কি পারব?’

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন