Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি
ছবি : সংগৃহীত

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ ভূমিকম্প ও তুষারধসের পর আকস্মিক বন্যা: পাঁচ শতাধিক বিদেশি পর্যটক নিখোঁজ

ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:
হিমালয়কন্যা নেপালে আকস্মিক ভুমিকম্পের পর সৃষ্ট প্রাণঘাতী তুষারধস ও ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলে শত শত মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের তালিকায় পাঁচ শতাধিক বিদেশি পর্যটক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
নেপালি পুলিশ বাহিনীর নিশ্চিত করা সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, বর্তমানে নিখোঁজ পর্যটকের সর্বমোট সংখ্যা ৫৭৯ জনে এসে ঠেকেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিখোঁজ পর্যটকদের ভেতর ৪৬৬ জন বিশ্বের ২৮টি স্বতন্ত্র দেশের নাগরিক বলে শনাক্ত করা গেছে।
পুলিশ প্রশাসনের বরাতে জানা যায়, নিখোঁজ হওয়া মোট পর্যটকদের মাঝে ১১৩ জন নেপালি, ৫৪ জন মার্কিন নাগরিক এবং ৩৩ জন ব্রিটিশ অধিবাসী রয়েছেন।
অন্যদিকে নেপাল পর্যটন বোর্ডের প্রকাশিত সর্বশেষ বিবরণী জানাচ্ছে, উধাও হওয়া ব্যক্তিবর্গের ভেতর ভারতের ১৩৩ জন নাগরিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
ভ্রমণ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর (ট্যুর অপারেটর) তথ্যসূত্র ধরে পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ যাত্রীদের একটি বৃহৎ অংশ ভারত ও নেপাল সীমারেখার সন্নিকটে অবস্থিত তীর্থক্ষেত্র মানসারোভরের অভিমুখে পথচলতি অবস্থায় ছিলেন।
এমতাবস্থায় নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বুধবার সায়াহ্নে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে যে, প্রলয়ঙ্করী এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ৯৫টি মৃতদেহ উদ্ধার সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে জোরদার উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান গতিশীল রয়েছে বলে নেপাল পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
এর পূর্বে বুধবার প্রাক-প্রভাতে নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুর উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত রসুয়া জেলাজুড়ে এই প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে।
স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ভূকম্পন অনুভূত হয় বলে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে পার্লামেন্ট সভায় স্পষ্ট করেছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল।
তিনি বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, ভূকম্পনের পরবর্তী ধাপে পর্বতচূড়ায় ভয়াবহ তুষারধস সূচিত হয় এবং এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে আকস্মিক বিধ্বংসী বন্যার সৃষ্টি হয়। তবে প্রাপ্ত এসকল তথ্য এখনও নিবিড়ভাবে যাচাইবাছাই করা হচ্ছে বলেও অভিমত দেন তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খানাল জোর দিয়ে বলেন, নেপালের সীমানা ছাড়িয়ে চীন ভূখণ্ডও এই দুর্যোগে “ব্যাপক ক্ষতির” সম্মুখীন হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় নেপাল বর্তমানে চীনা কর্তৃপক্ষের সাথে দ্বিপাক্ষিক সমন্বয় সাধনপূর্বক কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ২৬ জন পুলিশ সদস্য, ৯ জন সশস্ত্র পুলিশ সদস্য এবং সামরিক বাহিনীর ৪৪ জন সেনা সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন।
প্রশাসনিক অবকাঠামোর মধ্যে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নিখোঁজের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন বলে তিনি অবহিত করেন।
তাছাড়া সড়ক যোগাযোগ, নদীসেতু, দূরযোগাযোগ ব্যবস্থা ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর প্রভূত ক্ষতিসাধন ঘটেছে। বিশেষ করে রসুয়া ও নুওয়াকোট জেলাদ্বয় সর্বাধিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের প্রদত্ত পরিসংখ্যান মতে, অনাকাঙ্ক্ষিত নিখোঁজের খাতায় নথিভুক্ত বিদেশি নাগরিকদের বিবরণ:
১২ জন ব্রিটিশ নাগরিক
১০৫ জন ভারতীয়
৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয় (এনআরআই)
১৭ জন মালয়েশীয়
৪ জন দক্ষিণ আফ্রিকান
৩ জন আমেরিকান
১ জন অস্ট্রেলীয়
১ জন ডাচ
এছাড়াও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হারিয়ে যাওয়া আরও ১১১ জনের জাতীয়তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
তিব্বত সীমান্তে আড়াইশর বেশি নিখোঁজ
অপরদিকে দুই দেশের আন্তঃসীমান্তীয় সংবেদনশীল বাণিজ্যিক কেন্দ্রে সহসা ভূমিধসের কারণে “ব্যাপক হতাহতের” খবর প্রকাশ করেছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম।
পরিস্থিতির ভয়াবহতায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের জীবিত ও দ্রুত উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ অভিযান পরিচালনার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি দ্বিতীয় দফার উপজাত দুর্যোগ এড়াতে নজরদারি জোরদারকরণ ও পূর্বসতর্কতামূলক সংকেত চালুর জোর তাগিদ ব্যক্ত করেছেন।
চীনা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের তরফ থেকেও জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে বিশেষ উদ্ধারকারী দলকে তিব্বতে প্রেরণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
চীনা রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, চীন শাসিত তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ছাপ সুস্পষ্ট। স্থানীয় সময় রাত ৮টা পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যে তিব্বতের জিরং অঞ্চলে ভয়াবহ ধসে ৩ জনের প্রাণহানি এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রচারিত হয়েছে। সেখানে উদ্ধারকারী দল উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
চীনা বিমানবাহিনী কৌশলগত তিব্বত সীমান্তবর্তী জিরং শহরের আকাশে বিশেষ ড্রোন উড়িয়ে পর্যবেক্ষণ চালাতে সক্ষম হয়েছে, যাতে ভূমিধসপ্রবণ অঞ্চলের বাস্তবিক ধ্বংসচিত্র মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।
ভিডিও ফুটেজে সীমান্ত জনপদে কাদা ও পাহাড়ি পানির এক ভয়ানক মরণঘাতী ঢেউ আছড়ে পড়তে দেখা গেছে।
চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরও যুক্ত করে, পিপলস লিবারেশন আর্মি নিজেদের জরুরি সাড়াদান পরিকল্পনা কার্যকর রূপ দিয়েছে এবং আকাশপথে নজরদারি ও বিমানযোগে ত্রাণ সহায়তা মিশনের সার্বিক প্রস্তুতি হাতে নিয়েছে। যার অংশ হিসেবে পরিবহন বিমান, সামরিক হেলিকপ্টার ও ড্রোনবহর প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ভারতে নদীকেন্দ্রিক সতর্কতা জারি
নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রতিবেশী ভারতের বিহার রাজ্যের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা গণ্ডক নদীতে আকস্মিক বন্যার সম্ভাব্য সৃষ্টি নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা জারি করে স্থানীয় অধিবাসীদের সতর্ক থাকার আহ্বান পৌঁছে দিয়েছেন।
বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী জানান, রাজ্যের ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে নদীবাঁধ পাহারায় রাখা, গভীর রাতে টহল জোরদার এবং জরুরি সেবাদল প্রেরণের মতো পর্যাপ্ত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস স্থানীয়ভাবে জানিয়েছে, প্রায় তিন মিটার উচ্চতার ভয়াবহ ঢেউ আছড়ে পড়ার আশঙ্কাজনক উপাত্ত রয়েছে। তারা প্রকাশ করে, আজ বৈঠক পরবর্তী সময় থেকেই উপদ্রুত এলাকায় সার্বিক প্রস্তুতি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে এবং রাজ্যের ৩টি স্পর্শকাতর জেলায় জরুরি চিকিৎসাও সেবাদল মোতায়েন রয়েছে।
প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে একটি সমন্বিত স্থানান্তর পরিকল্পনাও প্রণয়ন করে রাখা হয়েছে।
নেপাল সেনাসূত্রে মুখপাত্র জানান, এ পর্যন্ত ৮৮ জন বন্যাকবলিত মানুষকে সফলভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং সেনারা মাইলুং গ্রাম থেকে অতিরিক্ত ১১৫ জনকে উদ্ধারে চরম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
রাজারাম বাসনেট সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে নিশ্চিত করেন, নিখোঁজদের অনুসন্ধান ও সংকটাপন্নদের উদ্ধারে মোট ১৫টি হেলিকপ্টার আকাশে নিয়োজিত রাখা হয়েছে।
নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশ করা হয়, তিমুরে, সিয়াব্রুবেসি এবং বেত্রাবতী অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও স্থাবর সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ মিলছে।
মন্ত্রণালয় থেকে আরও জানানো হয়, এই আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসে স্থানীয় ত্রিশুলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রভূত ক্ষতিসাধন হয়েছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের কালভার্ট ও সেতু ভেসে গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানা যায়, আকস্মিক প্রাকৃতিক এ দুর্যোগের পর থেকে ৮ জন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকের সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ স্থাপন করা যাচ্ছে না। ধসে পড়া এলাকাটিতে একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকাজে তাঁরা নিয়োজিত ছিলেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও যুক্ত করা হয়, সংশ্লিষ্ট এলাকায় আরও ১০ জন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক চরম বিপদে আটকা পড়ে আছেন এবং উদ্ধারের আকুল অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। নেপাল সরকার তাঁদের ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যেই বিশেষ হেলিকপ্টার পাঠিয়েছে।
নেপালে অবস্থানরত চীনা ব্যবসায়ী ইয়ে লিয়াং, যিনি কাঠমান্ডুভিত্তিক একটি পণ্য পরিবহন (লজিস্টিকস) প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী, তিনি তুলে ধরেন যে বন্যাকবলিত অঞ্চলে তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ৭টি কনটেনভারবাহী ট্রাক আটকে পড়ে আছে। উক্ত ট্রাকগুলোতে নেপালি চালক ও কর্মীরা দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তিনি বিবিসিকে উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, “আমরা তাদের কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারছি না। সেখানে কোনো সিগনাল নেই, তাই কারও কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।”
ব্যবসায়ী ইয়ে যুক্ত করেন, তাঁর জানা মতে এই আকস্মিক দুর্যোগ বিষয়ে পূর্বে কোনো সতর্ক সংকেত বা বার্তা প্রচার করা হয়নি।
তিনি আরও পর্যবেক্ষণ জানিয়ে বলেন, “মাঝেমধ্যে কাদাধস এবং ভূমিধস হতো, বিশেষ করে বর্ষাকালে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি অনেক বেশি গুরুতর বলে মনে হচ্ছে।”
সীমান্তের তিব্বত অংশে, সিচুয়ান প্রদেশের বাসিন্দা গুয়ান দাওশুয়ান বিবিসিকে জানান যে বুধবার দুপুরের দিকে তিনি তাঁর সহধর্মিণীর সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁর স্ত্রী তিব্বতের ভূখণ্ডে সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পে নিয়োজিত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।
গুয়ান উল্লেখ করেন, সকল সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নেপাল প্রশাসন বিশেষ হেলিকপ্টার পাঠিয়ে পরিস্থিতি সরজমিনে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা চালিয়েছিল। তবে উপদ্রুত অঞ্চলে প্রবল বৈরী বাতাসের বাধার কারণে উড়োজাহাজটির পক্ষে গন্তব্যে পৌঁছানো দুরুহ হয়ে পড়ছিল।

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন