Dhaka Orthoniti | ঢাকা অর্থনীতি

জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হচ্ছে: ভারতের মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআরের উদ্বেগ

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা অর্থনীতি ডেস্ক:

বাংলাদেশে চলমান ‘পুশব্যাক’ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারতের মানবাধিকার সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (এপিডিআর)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, অসংখ্য মানুষকে তাদের অসম্মতি সত্ত্বেও জোর করে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সীমান্ত অতিক্রম করানো কিংবা নো-ম্যানস ল্যান্ডে ফেলে রাখার মতো অনভিপ্রেত ঘটনাও ঘটছে।

সংগঠনটি মনে করে, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যকার বৈঠকের মাধ্যমে এই সংকটের স্থায়ী কোনো সমাধান আসবে না। এর জন্য প্রয়োজন দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরের জোরালো উদ্যোগ। সোমবার (৮ জুন) ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিএসএফ ও বিজিবির মহাপরিচালক পর্যায়ের উচ্চস্তরের বৈঠকে পুশব্যাক ও পুশইন ইস্যুটি এজেন্ডায় আসার পরিপ্রেক্ষিতে এপিডিআরের পক্ষ থেকে এই প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।

পশ্চিমবঙ্গের হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে সাধারণ মানুষকে আটকে রাখার পুরো প্রক্রিয়াটিকে বেআইনি ও অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, ‘পুশব্যাক বিষয়টিই বেআইনি, অসাংবিধানিক ও অমানবিক।’

সোমবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এপিডিআরের সহ-সভাপতি রঞ্জিত শূর বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, ইতোমধ্যে চার হাজার ৮০০ জনকে বিএসএফ বাংলাদেশে পুশব্যাক করেছে। আরও ৮০০ জন হোল্ডিং সেন্টারে আটক রয়েছেন এবং তারাও ‘পাইপলাইনে’ আছেন। তাদেরও বাংলাদেশে পাঠানো হবে। আমরা জানতে চাই, এই ৪ হাজার ৮০০ জন কারা? পাইপলাইনে থাকা ৮০০ জনই বা কারা? তাদের নাম-পরিচয় কী? সরকার শ্বেতপত্র প্রকাশ করে সত্য জানিয়ে দিক।”

তিনি সরকারের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে আরও বলেন, “একটি সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের জনগণের অধিকার আছে এসব মানুষের পরিচয় জানার। সরকারের এত গোপনীয়তা কেন? তথাকথিত হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে সাংবাদিক বা মানবাধিকারকর্মীদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না কেন? আমাদের দাবি, সেখানে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে এবং আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে, যাতে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ্যে আসে।”

আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে রঞ্জিত শূর মন্তব্য করেন, “ভারতের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো, কাউকে আদালতে হাজির না করে ২৪ ঘণ্টার বেশি আটক রাখা যায় না। তাহলে শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে মানুষকে দিনের পর দিন হোল্ডিং সেন্টারে আটকে রাখা হচ্ছে কীভাবে? হোল্ডিং সেন্টারে আটকের পুরো বিষয়টাই বেআইনি ও অসাংবিধানিক। পুশব্যাকও বেআইনি, অসাংবিধানিক এবং অমানবিক। আদালতের নির্দেশ ছাড়া সরকার কাউকে বিদেশি নাগরিক বলতে পারে না, আবার পুশব্যাকের নামে জোর করে অন্য দেশে পাঠাতেও পারে না।”

সীমান্ত বাহিনীর বৈঠকের সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “আমরা মনে করি না যে বিএসএফ-বিজিবির উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। আজ তারা যে সমঝোতাতেই পৌঁছাক না কেন, তা হবে সাময়িক। প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ভারতের অনুপ্রবেশ ও পুশব্যাক একটি রাজনৈতিক ইস্যু। এটিকে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।”

মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “পুশব্যাকের নামে বহু মানুষকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ গ্রহণ না করায় অনেক ক্ষেত্রে তাদের জোর করে সীমান্ত পার করানো হচ্ছে বা নো-ম্যানস ল্যান্ডে ফেলে রাখা হচ্ছে। এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। আমরা দাবি করছি, ভারত সরকার অবিলম্বে পুশব্যাক বন্ধ করুক।”

দুই প্রতিবেশীর ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে রঞ্জিত শূর বলেন, “একই ভাষা ও জাতিসত্তার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে মানুষের কিছু যাতায়াত থাকবেই, যেমন মিজোরাম ও মিয়ানমারের সীমান্তেও দেখা যায়। দুই দেশ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা করে সুসম্পর্ক গড়ে তুলুক। এটাই সময়ের দাবি। বিএসএফ-বিজিবির বৈঠকে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, কারণ এটি সামরিক নয়, রাজনৈতিক বিষয়। মানবাধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আলোচনায় বসুক। সদিচ্ছা থাকলে সমাধান অবশ্যই সম্ভব।”

অন্যদিকে, পুশব্যাক প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেছেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআইএম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম। উদ্ভূত পরিস্থিতিকে অমানবিক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “এটি অমানবিক এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। বিজেপি সরকার ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটাচ্ছে।”

অন্যান্য সীমান্তের উদাহরণ টেনে তিনি আরও বলেন, “ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উট সীমান্ত পার হলে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ফেরত দেয়া হয়। জেলেরা ধরা পড়লেও একই প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করা হয়। চীনের সঙ্গেও এমন ঘটনা ঘটলে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করা হয়। তাহলে ভারত ও বাংলাদেশ আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করতে পারে না কেন?”

তথ্যসূত্র: সেঅলওয়েজ ট্রুথ

ঢাকা অর্থনীতি

কমেন্ট করুন