বিবিসির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জেরেমি বোয়েন-এর বিশ্লেষনধর্মী লেখা থেকে:
আমি জানি, যখন কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট অভ্যুত্থানের ডাক দেন, কিন্তু সেটি শুরু হওয়ার পর নিজেরা তাতে আর জড়িত হন না—তখন কী ঘটতে পারে। কারণ, আমি এ রকম ঘটনা আগেও দেখেছি।
১৯৯১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ (সিনিয়র) একটি ভাষণ দিয়েছিলেন, যেটা নিয়ে সম্ভবত তিনি তাঁর ক্ষমতার মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত আফসোস করেছিলেন।
এটি ছিল সেই সময়, যখন ম্যাসাচুসেটসের একটি কারখানায় যুক্তরাষ্ট্র আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্যাট্রিয়ট তৈরি করত। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে দেশটি প্রথমবারের মতো তাদের অত্যাধুনিক এই সমরাস্ত্রটি ব্যবহার করেছিল।
প্রতিপক্ষের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করে প্যাট্রিয়ট। ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধে এই ক্ষেপণাস্ত্র এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
বুশ যখন প্যাট্রিয়ট তৈরির কারখানা পরিদর্শনে যান, মার্কিন বাহিনী তখন ‘ডেজার্ট স্টর্ম’ অভিযান চালাচ্ছিল। কুয়েত থেকে ইরাকি সৈন্যদের বের করে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ওই বৃহৎ সামরিক অভিযান চালিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং তাদের মিত্রদের যৌথ বিমানবাহিনী ইরাকি সৈন্যদের এবং ইরাকের শহরগুলোর ওপর প্রচণ্ড আঘাত করছিল।
মিত্রবাহিনীর হাজার হাজার সৈন্য স্থলযুদ্ধের জন্য ইরাক–কুয়েত সীমান্তে জড়ো হয়েছিল, স্থলযুদ্ধ তখনো ৯ দিন দূরে।
আমি তখন বাগদাদে, যুদ্ধের খবর পাঠানো নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছি।
মাত্র কয়েক দিন আগে, বাগদাদের কাছের আমিরিয়াহ শহরতলির একটি আশ্রয়কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালিয়ে চার শতাধিক বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে।
মার্কিন ও ব্রিটিশরা দাবি করেছিল, সেটি একটি কমান্ড সেন্টার ছিল, কিন্তু আমি সেখানে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো দেখেছি, প্রায় সবই শিশু, নারী ও বৃদ্ধ পুরুষ। আশ্রয়কেন্দ্রটি তখনো জ্বলছিল, ধোঁয়া উড়ছিল। তাই আমি জানতাম, তাদের দাবি সত্য নয়।
সেই সময়ে, আমি বুশের ভাষণটি ঠিকমত লক্ষ করিনি।
কিন্তু ৩৫ বছর পর, আমি যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ইরানের জনগণকে এটা বলতে শুনি, এক প্রজন্মের ভেতর ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করার সুযোগ ইরানিরা একবারই পাচ্ছে। অথচ তাঁরা ইরানি জনগণকে অভ্যুত্থানচেষ্টায় সরাসরি সামরিক সমর্থনের কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না, তখন আমি সেই ভাষণ নিয়ে ভাবতে বসি।
বুশ প্যাট্রিয়ট কারখানায় গিয়ে যে শ্রমিকেরা সেটি তৈরি করেছেন, তাঁদের উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন। সে সময় প্যাট্রিয়টকে একধরনের অলৌকিক অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
কয়েকটি সংক্ষিপ্ত অনুচ্ছেদে প্রেসিডেন্ট বুশ বলেছিলেন, ইরাকের শাসক সাদ্দাম হোসেনকে কুয়েত থেকে সেনা প্রত্যাহারের জন্য জাতিসংঘের প্রস্তাব মেনে চলা উচিত।
প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আইনি অনুমোদন ছিল, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যেটা নেই।
ভাষণে বুশ কয়েকটি লাইন বললেন, যার প্রচণ্ড প্রভাব ফেলেছিল।
বুশ বলেছিলেন, ‘রক্তপাত বন্ধ করার আরেকটি উপায় আছে…এবং সেটা হলো ইরাকি সেনাবাহিনী ও ইরাকি জনগণকে নিজেদের উদ্যোগে এগিয়ে এসে স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনকে পদত্যাগে বাধ্য করা…।’
শ্রমিকেরা উচ্ছ্বসিত হয়ে চিৎকার করেছিল ও হাততালি দিয়েছিলেন, আর প্রেসিডেন্ট ফিরে গিয়েছিলেন সেই মার্কিনদের উৎসাহিত করতে, যারা ভিয়েতনাম বিপর্যয়ের পর প্রথম কোনো বড় যুদ্ধ করছিল।
কিছু ইরাকি বুশের বক্তব্য খুবই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করলেন।
ইরাকি সৈন্যদের কুয়েত থেকে বিতাড়িত করার পর একটি যুদ্ধবিরতি সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখল বটে। কিন্তু দেশের দক্ষিণে ইরাকি শিয়ারা এবং উত্তরে কুর্দিরা তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করল।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে এবং অন্যান্য মিত্রদেশ, যারা যৌথ বাহিনী তৈরি করেছিল—তারা কী ঘটছে তার ওপর নজর রাখছিল। কিন্তু হস্তক্ষেপ করল না।
যুদ্ধে ইরাকি শাসনব্যবস্থা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু তাদেরকে তাদের হেলিকপ্টাগুলো রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ওই হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ইরাক সরকার প্রতিশোধমূলক অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার কুর্দি ও ইরাকি শিয়া মুসলিমদের হত্যা করে। অথচ এরাই বিশ্বাস করেছিল, তাদের বিদ্রোহে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন আছে। তারা এটা ভেবে ভুল করেছিল, তাদের বিদ্রোহ সফল হওয়া নিশ্চিত করতে তিনি (মার্কিন প্রেসিডেন্ট) হস্তক্ষেপ করবেন।
সে সময় আমি কুর্দিস্তানের উত্তরাঞ্চলের তুষারে ঢাকা বরফঠান্ডা পর্বতে গিয়েছিলাম। সাদ্দাম হোসেনের সৈন্যদের ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী হাজার হাজার কুর্দি শরণার্থী প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বরফঢাকা ওই পর্বতগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
প্রতিদিন সকালে আমি দেখতাম, বাবারা তাদের সন্তানদের মৃতদেহ নামাচ্ছে, মৃতদেহগুলো ছোট ছোট লেপে মুড়ে রাখা। এসব শিশু পাহাড়ের ঢালে খোলা আকাশের নিচে তীব্র ঠান্ডায় বা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
শেষ পর্যন্ত মার্কিনরা, ব্রিটিশরা, ফরাসিরা এবং অন্যরা লজ্জায় পড়ে কুর্দিদের উদ্ধার করতে একটি বড় মানবিক অভিযান চালাতে বাধ্য হয়েছিল। দক্ষিণে, শিয়া মুসলিমদের ভাগ্যে অবশ্য সেটাও জোটেনি।
প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সেই পরিণতি অনেক বছর ধরে চলতে থাকল, নো-ফ্লাই জোন (জাতিসংঘ ১৯৯১ সালে ইরাকের ওপর একটি নো-ফ্লাই জোন বা বিমান উড্ডয়ন নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণা করেছিল) কার্যকর করার জন্য বিমান পর্যবেক্ষণ চালানোর প্রতিশ্রুতি, স্থায়ী মার্কিন ঘাঁটি এবং সৌদি আরবে একজন তরুণ ওসামা বিন লাদেনের জন্ম, যিনি মনে করতেন, বিদেশি সেনারা ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা লঙ্ঘন করেছে। তিনি একটি সংস্থা গড়ে তোলা শুরু করেন, যেটি পরে আল-কায়েদা হিসেবে পরিচিত হয়।
প্রতিটি উপসাগরীয় যুদ্ধ পরবর্তী যুদ্ধের বীজ রোপণ করে। ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় বুশ ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে বাবার অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করেন।
ওই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিজয়ীদের একজন ছিল ইরান। যুক্তরাষ্ট্র সদয় হয়ে তাদের বড় শত্রু সাদ্দাম হোসেনকে সরিয়ে দিয়েছিল।
এবারের এই তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের লক্ষ্য হলো—২০০৩ সালের পর দ্রুত আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের উত্থানকে প্রতিহত করা।
ইরানের ওপর বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে, যেন তাদের সামরিক ও পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা ধ্বংস করা যায়। বিশেষ করে ইসরায়েল নিজেদের অস্তিত্বের জন্য ইরানকে হুমকি হিসেবে দেখে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে একটি যুদ্ধ শুরু করেছে। যদিও ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিকের পছন্দ হয়নি, সাম্প্রতিক জরিপে এমনটাই দেখা যাচ্ছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্য উদ্বেগজনক, যদিও অতি অবশ্যই সেই মিত্রদের দলে ইসরায়েল নেই।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যাঁরা সংশয় প্রকাশ করছেন, যদি তাঁরা ভুল হন? হতে পারে, বিশ্লেষক ও মন্তব্যকারীরা ট্রাম্পের প্রতি তাদের ব্যক্তিগত বিরূপ মনোভাবের কারণে তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন।
এই যে ট্রাম্প তাঁর ওই সব মিত্রকে অবমাননা করেন, যাদের সৈন্যরা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে মার্কিন সৈন্যদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন, মৃত্যুবরণ করেছেন। অথবা মাঝে মাঝে তিনি যে মিথ্যা কথা বলেন, হয়তো সেগুলো তেমন কোনো বিষয় নয়।
এই যেমন ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান নিজেই তাদের একটি স্কুলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ১৬৫ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করেছে, যাদের বেশির ভাগই ওই বালিকা বিদ্যালয়ের ছোট ছোট শিক্ষার্থী। অথচ ইরানের কাছে কোনো টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নেই।
ট্রাম্প ও তাঁর গোঁড়া সমর্থকেরা এই সবকিছুকে ভুয়া খবর বলেছেন।
তাঁরা বলছেন, সাময়িকভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও যদি এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র ও দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়া থেকে প্রতিহত করা যায়, তবে সেটা বেশি মূল্যবান হবে।
তাদের যুক্তি, ইরানের এসব অস্ত্র শুধু উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য নয়, বরং ইউরোপ, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও হুমকি হয়ে উঠত।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ—যিনি এখন যুদ্ধমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত—তিনি জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া বা আত্মরক্ষার যথেষ্ট যুক্তি ছাড়াই শক্তি প্রয়োগের ব্যাপারে ইউরোপীয় দেশগুলোর অনিচ্ছার তীব্র সমালোচনা করেছেন।
যদিও এরই মধ্যে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে, এ যুদ্ধের ইতি টানা খুব একটা সহজ হবে না। এর পরিণতি সর্বোচ্চ অজানা ও সবচেয়ে বিপজ্জনক হতে পারে।
এই যুদ্ধে ইসরায়েলের নিজস্ব লক্ষ্য রয়েছে। নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে জানেন, তিনি কী চান। তিনি বিশ্বাস করেন, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করার মাধ্যমে তিনি তাঁর জীবনের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন।
যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে একটি ভাষণে এই যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায়, ইসরায়েল এটা করতে সক্ষম হয়েছে। ৪০ বছর ধরে আমি যা করার অপেক্ষায় ছিলাম, সন্ত্রাসবাদী শাসনকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা। আমি এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছি এবং আমরা এটা করবই।’
ট্রাম্পের মতো উগ্রপন্থী নেতানিয়াহুও ইরানে গণ–অভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছেন।
ইরানে সহিংস বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়া নিয়ে ইসরায়েলকে উদ্বিগ্ন বলে মনে হয় না। বরং তাদের জন্য এটি সম্ভবত একটি ইতিবাচক ফলও হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের সমর্থকেরা বিশ্বাস করেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করলে পৃথিবী আরও নিরাপদ হবে।
কিন্তু এ যুদ্ধের পরিণতি যদি ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর যে মহাবিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছিল, তেমন হয়, তবে তাঁরা ভুল প্রমাণিত হবেন।
ইরাকে কার্যকরভাবে নতুন শাসনব্যবস্থা স্থাপন করার কোনো পরিকল্পনা ছাড়া সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করার ফলে বহু বছর দেশটিতে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড এবং গৃহযুদ্ধ চলেছে, লাখো মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
ক্ষমতার শূন্যতা সেখানে চরমপন্থীদের বিকাশ ঘটিয়েছিল, যারা পরে ইসলামিক স্টেটরূপে আবির্ভূত হয়েছিল। এবারও তাদের উত্তরাধিকারীরা নতুন এই সংকটকে কাজে লাগানোর সুযোগ খুঁজবে।
নেতানিয়াহু বহুবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার কথা ভেবেছেন। কিন্তু সব সময় তিনি এটা জানতেন, এ জন্য ইসরায়েলের এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সহায়তা প্রয়োজন, যিনি নিজেও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। শেষমেশ, তাদের সেই প্রেসিডেন্ট হলেন—ডোনাল্ড ট্রাম্প।
পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টরা—যাদের মধ্যে বিল ক্লিনটনও আছেন, নেতানিয়াহু ৩০ বছর আগে প্রথমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছিলেন, তিনি এ যুদ্ধ করতে রাজি হননি।
ওই সব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানকে সীমার মধ্যে রাখা এবং প্রতিহত করাতেই সন্তুষ্ট ছিলেন। তাদের পরিকল্পনায় ছিল, যদি ইরান সত্যিই কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার চেষ্টা করে, যুদ্ধকে শুধু তখনই ব্যবহার করা হবে।
এখন যা ঘটছে, সেটার কারণেই আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেননি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার বিরুদ্ধে ইরান তাদের প্রতিরোধযুদ্ধ সাজিয়েছে মার্কিন শক্তিকে অবজ্ঞা করতে, যুদ্ধকে ছড়িয়ে দিতে, বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সতর্কভাবে নির্মিত মিত্রতাকে বিঘ্নিত করতে।
এবার ইরান তাদেরকে (মার্কিন মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে) লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। এসব দেশ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতার মূল্য এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করবে। বিশেষ করে ট্রাম্প যদি যুদ্ধে জয় ঘোষণা দিয়ে বেরিয়ে যান এবং সৌদি আরব ও অন্যান্য দেশের ঘাড়ে সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে যান। এ পরিস্থিতির সুবিধা নিতে চীন প্রস্তুত হয়েই আছে।
এমন পরিস্থিতিতে যদি ট্রাম্প চীনকে মোকাবিলা করতে চান, তবে তাঁকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সৈন্য রাখতেই হবে। অথচ তিনি মার্কিনদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো অন্তহীন যুদ্ধে জড়াবে না।
ইসরায়েলিদের জন্য বিষয়টি অবশ্য একেবারেই সোজাসাপটা। তারা এটিকে তাদের জীবনে মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্বিন্যস্ত করার এবং নিজেদের অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করার সেরা সুযোগ হিসেবে দেখছে।
তারা (ইসরায়েল) লেবাননে ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে। সেই ১৯৯০–এর দশক থেকে তারা এই চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্বের নজর যখন ইরানের দিকে, তখন ইসরায়েল অধিক কার্যকরভাবে অধিকৃত পশ্চিম তীরে নিজেদের দখলে আরও সুদৃঢ় করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ট্রাম্প হয়তো এ যুদ্ধ থেকে শিখবেন, যুদ্ধ শুরু করা শেষ করার চেয়ে অনেক বেশি সহজ। যদি আপনি না জানেন, কোথায় যাচ্ছেন, তাহলে কখন থামতে হবে, তা বোঝা কঠিন।
এটি আরও কঠিন হয়ে যায়, যখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে দেখে মনে হয়, একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়াই তারা যুদ্ধে গেছে এবং গেছে এমন এক প্রেসিডেন্টের অধীনে, যিনি একাই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।









কমেন্ট করুন